প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬
শিশুদের প্রিয় খাবার নিয়েই শঙ্কা, নকলায় আইসক্রিম কোনে ক্ষতিকর রং ব্যবহারের অভিযোগে অভিযান
মোঃ হাবিব, নির্বাহী সম্পাদক ||
শেরপুরের নকলায় শিশুদের বহুল পছন্দের আইসক্রিমকে ঘিরে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক অভিযোগ। স্থানীয়ভাবে তৈরি আইসক্রিমের কোনে ক্ষতিকর রং ব্যবহারের অভিযোগে মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছে প্রশাসন। একই সঙ্গে জব্দ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ পণ্য, যা পরে তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করা হয়।ঘটনার পর পুরো এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশুদের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, গ্রামের বাজারে বিক্রি হওয়া খাবারের মান নিয়ে আগে থেকেই শঙ্কা ছিল, তবে এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর আতঙ্ক আরও বেড়েছে।কোথায় ও কী অভিযোগে অভিযানবৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল ২০২৬) শেরপুর জেলার নকলা উপজেলার গনপদ্দী ইউনিয়নের খারজান মধ্যপাড়া এলাকায় এ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। অভিযান পরিচালনা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি), নকলা।প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত আইসক্রিমের কোন তৈরিতে এমন কিছু রং ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়, যা ভোক্তাদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।এ সময় রংমিশ্রিত বলে সন্দেহ হওয়া বিপুল পরিমাণ আইসক্রিম কোন জব্দ করে ঘটনাস্থলেই বিনষ্ট করা হয়।গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযানঅভিযানে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রশাসন ওই এলাকায় অভিযান চালায়। অভিযানে গিয়ে দেখা যায়, আইসক্রিমের কোন তৈরিতে এমন কিছু রং ব্যবহার করা হচ্ছে, যা খাদ্যমান অনুযায়ী অনুমোদিত কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রাথমিক যাচাইয়ের পর দ্রুত ব্যবস্থা নেন। অভিযানে উপস্থিত ছিলেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, শেরপুরের সহকারী পরিচালক, স্যানিটারি ইন্সপেক্টর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, “ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেলে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে।”তবে অভিযানে জরিমানার মুখে পড়া প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।আতঙ্কে অভিভাবকরাঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। বিশেষ করে শিশুদের খাবারে ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহারের অভিযোগ অভিভাবকদের মধ্যে শঙ্কা বাড়িয়েছে।খারজান মধ্যপাড়ার এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা তো দোকান থেকে কিনে বাচ্চাদের খেতে দিই। কোনটা ভালো, কোনটা ক্ষতিকর—এসব বুঝার উপায় নেই। এখন ভয় লাগছে।”আরেকজন অভিভাবক বলেন, “গ্রামের দিকে খাদ্যের মান নিয়ে তেমন নজরদারি হয় না। প্রশাসনের এমন অভিযান নিয়মিত হলে অন্তত ব্যবসায়ীরা একটু সতর্ক থাকবে।”স্থানীয় কয়েকজন দোকানদারও বলছেন, অনেক সময় তারা নিজেরাও জানেন না কোন পণ্য কীভাবে তৈরি হচ্ছে। ফলে সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করেই পণ্য বিক্রি করতে হয়।খাদ্যে রং ব্যবহারের ঝুঁকি কতটা?খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টদের মতে, অনুমোদনহীন বা অতিরিক্ত রাসায়নিক রং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের শরীরে এসব উপাদানের প্রভাব বেশি পড়ার আশঙ্কা থাকে।চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিম্নমানের রং নিয়মিত গ্রহণ করলে অ্যালার্জি, পেটের সমস্যা, ত্বকের জটিলতা কিংবা অন্যান্য শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। যদিও এই ঘটনায় ব্যবহৃত রংয়ের প্রকৃতি নিয়ে বিস্তারিত পরীক্ষার তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবুও অভিযোগটিই জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, আইসক্রিম বা শিশুদের প্রিয় খাবারগুলোতে রং ও ফ্লেভারের ব্যবহার অনেক বেশি হওয়ায় সেগুলোর মান নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ শিশুদের আকৃষ্ট করতে অনেক সময় খাবারকে অস্বাভাবিক উজ্জ্বল রঙে তৈরি করা হয়।কেন বাড়ছে এমন অভিযোগ?সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় খাদ্যে ভেজাল, নিম্নমানের উপাদান কিংবা অনুমোদনহীন রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত লাভের আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কম খরচে পণ্য আকর্ষণীয় দেখানোর চেষ্টা করেন।তবে শুধু ব্যবসায়ীদের দায় দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না বলেও মনে করছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, নিয়মিত তদারকি, খাদ্য পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভোক্তাদের সচেতনতা—সবকিছু একসঙ্গে বাড়াতে হবে।একই সঙ্গে স্থানীয় ক্ষুদ্র উৎপাদকদেরও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কারণ অনেক সময় তারা না বুঝেই এমন উপাদান ব্যবহার করেন, যা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।প্রশাসনের কড়া বার্তাপ্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, খাদ্যে ভেজাল বা ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহারের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান থাকবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে বলেছেন, অনুমোদিত উপাদান ছাড়া খাদ্য উৎপাদন করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।ভোক্তাদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সন্দেহজনক খাবার বা নিম্নমানের পণ্য দেখলে দ্রুত প্রশাসনকে জানাতে বলা হয়েছে।স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করছে, নিয়মিত অভিযান চালানো হলে বাজারে নিম্নমানের খাবারের প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে। তবে একদিনের অভিযান দিয়ে পুরো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলেও মত দিয়েছেন অনেকে।উপসংহারনকলায় আইসক্রিম কোনে ক্ষতিকর রং ব্যবহারের অভিযোগে পরিচালিত এই অভিযান আবারও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের খাবার ঘিরে এমন অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনের নজরদারির পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল আচরণ এবং ভোক্তাদের সতর্কতা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কার্যকর না হলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে স্থানীয়রা আশা করছেন, এমন অভিযান নিয়মিত হলে অন্তত নিম্নমানের খাদ্য উৎপাদনের প্রবণতা কিছুটা হলেও কমবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর