প্রকাশের তারিখ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬
লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত চা শিল্প: কাঁচা পাতা নষ্ট, উৎপাদন ও মানে ধাক্কা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ের প্রভাব এবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে চা শিল্পে। বাগানে পর্যাপ্ত কাঁচা পাতা থাকলেও সময়মতো প্রক্রিয়াজাত করতে না পারায় তার বড় অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে উৎপাদন যেমন কমছে, তেমনি মান খারাপ হওয়ায় বাজারেও দাম পড়ছে নিম্নমুখী।বিদ্যুৎ সংকটে থমকে যাচ্ছে উৎপাদনচা শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি মৌসুমে চা পাতার ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দিনের দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানার মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।বাংলাদেশের প্রধান চা উৎপাদন অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে Moulvibazar, Habiganj, Sylhet, Chattogram এবং Panchagarh। এসব এলাকায় মোট ১৭২টি চা-বাগান রয়েছে, যেখানে উৎপাদন কার্যক্রম সরাসরি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল।একজন বাগান ব্যবস্থাপক বলেন, “দিনে ৮ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে কারখানার কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।”সময়মতো প্রক্রিয়াজাত না হলে নষ্ট হচ্ছে পাতাচা প্রক্রিয়াজাতকরণ একটি সময়সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। পাতা তোলার পর দ্রুত উইদারিং, রোলিং, ফারমেন্টেশন, ড্রাইং ও সর্টিং সম্পন্ন করতে হয়।বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব ধাপ শেষ না হলে পাতার রং, স্বাদ ও গন্ধ নষ্ট হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে পুরো ব্যাচ বাতিল করতে হয়।একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শর্তে জানান, “কাঁচা পাতা সংগ্রহের পর যদি দ্রুত কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করা না যায়, তাহলে তা আর মানসম্মত থাকে না। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।”জেনারেটরে ভরসা, বাড়ছে উৎপাদন খরচবিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় অনেক চা-বাগান এখন ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে। তবে এতে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।জানা গেছে, মাঝারি একটি চা কারখানায় দিনে ১০০ থেকে ১৫০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল প্রয়োজন হয়। এতে করে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার জন্য চাপ তৈরি করছে।একজন উদ্যোক্তা বলেন, “জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন চালিয়ে রাখা সম্ভব, কিন্তু এতে লাভের অংশ কমে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।”লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শঙ্কাসরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।চলতি বছর লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়ানো হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অর্জন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মার্চ থেকে নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত যে মৌসুমে চা পাতা সংগ্রহ হয়, সেই সময়েই বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।বিদ্যুৎ সংকটের পেছনের কারণবিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে রয়েছে জ্বালানি ঘাটতি, গ্যাসের অভাব এবং কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়া। এর সঙ্গে গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়াও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।ফলে জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতে—বিশেষ করে চা শিল্পের মতো বিদ্যুৎনির্ভর খাতে।বাজারে সম্ভাব্য প্রভাববর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। উৎপাদন কমে গেলে চায়ের সরবরাহ হ্রাস পাবে, যা দাম বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।একই সঙ্গে মান খারাপ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চায়ের অবস্থান দুর্বল হতে পারে। এতে রপ্তানি কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।ঐতিহ্যবাহী খাতে নতুন চ্যালেঞ্জবাংলাদেশের চা শিল্প একটি ঐতিহ্যবাহী খাত, যার সূচনা ব্রিটিশ আমলে। বর্তমানে দেশের উৎপাদিত চায়ের বড় অংশ স্থানীয় বাজারেই ব্যবহৃত হয়। তবে একসময় রপ্তানিতেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিল।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদন বাড়লেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি কমেছে। এর মধ্যে নতুন করে বিদ্যুৎ সংকট শিল্পটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।প্রশাসনের ভূমিকা ও দাবিচা-বাগান সংশ্লিষ্টরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে, তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।উপসংহার
সব মিলিয়ে, পর্যাপ্ত কাঁচা পাতা থাকা সত্ত্বেও তা কাজে লাগাতে না পারার এই পরিস্থিতি দেশের চা শিল্পে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে উৎপাদন, মান এবং বাজার—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর