প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬
বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত চা-বাগান, বাড়ছে উৎপাদন খরচ
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে নতুন করে সংকটে পড়েছে বাংলাদেশের চা শিল্প। বাগানে প্রচুর কাঁচা পাতা থাকলেও সময়মতো প্রক্রিয়াজাত করতে না পারায় তার বড় অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে মানও খারাপ হয়ে বাজারে দাম কমে যাচ্ছে।
চা শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বছর চা পাতার ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে সেই সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দিনের প্রায় অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানার মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে কাঁচা পাতা সংগ্রহের পর দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছে না, আর এতে পাতা পচে যাচ্ছে বা মান হারাচ্ছে।
বাংলাদেশে চা উৎপাদনের প্রধান অঞ্চল হলো মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম ও পঞ্চগড়। এসব এলাকায় মোট ১৭২টি চা-বাগান রয়েছে। এর বেশিরভাগই বেসরকারি মালিকানাধীন, তবে কিছু বাগানে সরকারেরও অংশীদারিত্ব আছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। চলতি বছর লক্ষ্যমাত্রা আরও বেশি হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অর্জন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চা-বাগানের কর্মকর্তারা জানান, মার্চ থেকে নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত চা পাতা সংগ্রহের মৌসুম চলে। এই সময়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গত দেড় মাস ধরে নিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অনেক বাগানে দিনে ৮ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে কারখানায় কাজ বন্ধ থাকে দীর্ঘ সময়।
চা প্রক্রিয়াজাত করার ধাপগুলো খুবই সময়সংবেদনশীল। পাতা তোলার পর দ্রুত উইদারিং, রোলিং, ফারমেন্টেশন, ড্রাইং এবং সর্টিং করতে হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসব কাজ না হলে পাতার স্বাভাবিক রং, স্বাদ ও গন্ধ নষ্ট হয়ে যায়। এমনকি পুরো ব্যাচ বাতিলও করতে হয় অনেক সময়। এ কারণেই বিদ্যুৎ বিভ্রাট সরাসরি উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
অনেক বাগান এখন ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে। তবে এতে খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। মাঝারি একটি কারখানায় দিনে ১০০ থেকে ১৫০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল লাগে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
এদিকে বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে রয়েছে জ্বালানি ঘাটতি, গ্যাসের অভাব এবং কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়া। সাম্প্রতিক সময়ে গরম বাড়ার কারণে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতে।
চা শিল্প বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী খাত। ব্রিটিশ আমল থেকেই এ দেশে বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয়। বর্তমানে দেশের উৎপাদিত চায়ের বড় অংশ স্থানীয় বাজারেই ব্যবহার হয়। তবে অতীতে বাংলাদেশ চা রপ্তানিতেও উল্লেখযোগ্য অবস্থানে ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদন বাড়লেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি কমে এসেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শুধু উৎপাদন নয়, বাজারেও প্রভাব পড়বে। চায়ের সরবরাহ কমে গেলে দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
চা-বাগানের ব্যবস্থাপকরা বলছেন, দ্রুত বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ক্ষতি আরও বাড়বে। তারা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, চা পাতা থাকা সত্ত্বেও তা কাজে লাগাতে না পারার এই পরিস্থিতি শিল্পের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে দেশের চা শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর