প্রকাশের তারিখ : ২১ এপ্রিল ২০২৬
জ্বালানির অজুহাতে বেসরকারি ডিপোতে সারচার্জ বৃদ্ধি: সংকটে আমদানি-রপ্তানি খাত
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য খাতে। ডিজেলের দাম বাড়ার কারণ দেখিয়ে দেশের বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোতে (অফডক) আকস্মিক ৮.৫ শতাংশ সারচার্জ বৃদ্ধি করা হয়েছে। কোনো আগাম ঘোষণা বা অংশীজনদের সাথে আলোচনা ছাড়াই নেওয়া এই সিদ্ধান্তে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীরা। তাদের আশঙ্কা, এই বাড়তি খরচ দেশের অর্থনীতি ও বিদেশের বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলবে।হুট করে কার্যকর হলো নতুন মাশুলসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি ডিপো মালিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন’ (বিকডা) গত রবিবার (১৯ এপ্রিল) রাত থেকেই নতুন এই সারচার্জ কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ব্যবসায়ীদের অবাক করে দিয়ে সোমবার চিঠি পাঠিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বর্ধিত চার্জের কথা জানানো হয়। বন্দর নগরী চট্টগ্রামের আশেপাশে থাকা ২১টি বেসরকারি ডিপোর মাধ্যমে বর্তমানে দেশের প্রায় সব রপ্তানি পণ্য এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমদানি পণ্য হ্যান্ডলিং করা হয়। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে প্রতিটি কনটেইনারের পেছনে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হবে।কেন বাড়ল এই খরচ?ডিপো মালিকদের দাবি, বর্তমানে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজেলের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। ডিপো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ক্রেন, বড় যন্ত্রপাতি এবং অভ্যন্তরীণ ট্রাক চলাচলে প্রচুর পরিমাণ জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয়। পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই তারা সারচার্জ বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন। বিকডার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্ধিত ব্যয় সমন্বয় না করলে ডিপোগুলো সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ত।পোশাক খাতে বড় ধাক্কার আশঙ্কাএই সারচার্জ বৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে যাচ্ছে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প (RMG)। পরিসংখ্যান বলছে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রপ্তানি হওয়া পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই পোশাক খাতের। আর এই বিশাল পরিমাণের পণ্য জাহাজীকরণের আগে বেসরকারি ডিপোগুলোতে প্রক্রিয়াজাত করা হয়।তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, "ব্যবহারকারীদের সাথে কোনো আলোচনা না করে একতরফাভাবে মাশুল বাড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। গত এক বছরেই দুইবার চার্জ বাড়ানো হয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিচ্ছে।" তিনি আরও জানান, গত কয়েক বছরে নানা সংকটে প্রায় ৩৫০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে এই খরচ আরোপ করা মানে মৃতপ্রায় কারখানার ওপর বোঝার ওপর শাকের আঁটি।আলোচনার অভাব ও সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকিচট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে এই বেসরকারি ডিপোগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বছরে প্রায় ১০ লাখের বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা এই অফডকগুলোতে সামান্য মাশুল বাড়লেও তার প্রভাব পড়ে পুরো সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থায়। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে খরচ বাড়বে—এটি বাস্তবসম্মত হলেও, সিদ্ধান্তটি নেওয়ার আগে সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর সাথে সমন্বয় করা জরুরি ছিল। সমন্বয়হীন এই সিদ্ধান্ত দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য নীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানের দাবিবর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ কমানো জরুরি। কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়ার অজুহাতে সেবা খাতের খরচ বৃদ্ধি সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের রপ্তানি খাতকে সচল রাখতে এবং ডিপো মালিকদের দাবি বিবেচনা করতে সরকার ও স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে দ্রুত একটি ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান বের করা উচিত।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর