প্রিন্ট এর তারিখ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মেগা প্রকল্পে ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি, দুই মেট্রোরেলে খরচ দ্বিগুণেরও বেশি
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
নতুন দুই মেট্রোরেল প্রকল্পে ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি, অনিশ্চয়তায় নির্মাণরাজধানী ঢাকার নতুন দুটি মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। উত্তরা–মতিঝিল মেট্রোরেলের তুলনায় নতুন দুই লাইনে প্রতি কিলোমিটার নির্মাণ ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় সরকার এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।ব্যয়ের তুলনায় বিস্ময়কর ব্যবধানউত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১,৫৭৪ কোটি টাকা। সেখানে নতুন দুই লাইনে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩,৬১৮ কোটি টাকা।দুটি প্রকল্প মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা—যা দেশের অবকাঠামো খাতে অন্যতম বড় ব্যয়ের নজির হতে পারে।কোন দুটি লাইন নির্মাণের অপেক্ষায়নির্মাণের অপেক্ষায় থাকা দুটি মেট্রোরেল প্রকল্প হলো—
কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর এবং নর্দ্দা থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত এমআরটি লাইন–১
দৈর্ঘ্য: ৩১ কিলোমিটারের বেশি
আংশিক উড়াল, আংশিক পাতালপথ
হেমায়েতপুর থেকে মিরপুর, গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত এমআরটি লাইন–৫ (উত্তর)
দৈর্ঘ্য: প্রায় ২০ কিলোমিটার
উড়াল ও পাতালপথের সমন্বয়অনুমোদিত ব্যয় বনাম সম্ভাব্য ব্যয়প্রকল্পঅনুমোদিত ব্যয়সম্ভাব্য ব্যয়MRT Line-1৫২,৫৬১ কোটি টাকা৯৬,৫০০ কোটি টাকাMRT Line-5 (North) ৪১,২৩৮ কোটি টাকা৮৮,০০০ কোটি টাকামোট৯৩,৭৯৯ কোটি টাকা১,৮৪,৫০০ কোটি টাকাব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণবিশ্লেষকদের মতে, ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে—১. দরপত্রে প্রতিযোগিতার অভাবমেট্রোরেল প্রকল্পে দরপত্রে মূলত জাপানি ঠিকাদারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা সীমাবদ্ধ। ফলে বাজারমূল্যের প্রতিযোগিতামূলক দর পাওয়া যাচ্ছে না।২. ঋণদাতা সংস্থার শর্তজাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা JICA প্রকল্প অর্থায়নে বেশ কিছু প্রকৌশলগত শর্ত আরোপ করেছে। এসব শর্তের কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়েছে।৩. সম্ভাব্য যোগসাজশের অভিযোগকিছু প্যাকেজে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক ব্যয়ের প্রস্তাব এবং সীমিত অংশগ্রহণের কারণে ঠিকাদারদের মধ্যে যোগসাজশের সন্দেহ করা হচ্ছে।আন্তর্জাতিক তুলনায় ব্যয়ের পার্থক্যডিএমটিসিএলের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জমি অধিগ্রহণ ও বেতন-ভাতা বাদ দিয়ে ভারতে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় হয় মাত্র ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা। সেখানে ঢাকার নতুন প্রকল্পগুলোতে ব্যয় কয়েকগুণ বেশি।আয় বনাম ঋণ পরিশোধের চাপউত্তরা–মতিঝিল মেট্রোরেল থেকে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা (অনিরীক্ষিত)। অথচ ২০৩০–৩১ সাল পর্যন্ত বছরে ঋণের কিস্তি বাবদ ৪৬৫ থেকে ৭৪০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে।প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তাব্যয় কমানোর জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ঋণদাতা ও ঠিকাদারদের সঙ্গে আলোচনা করলেও সন্তোষজনক সাড়া না পাওয়ায় প্রকল্পে আগ্রহ দেখায়নি। এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নতুন সরকারের ওপর নির্ভর করছে।বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তাবাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়–এর পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক সতর্ক করে বলেন, প্রতিযোগিতা ছাড়া এ ধরনের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে দেশের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি হবে। ব্যয় কমাতে দরপত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দেন।ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের অপেক্ষাডিএমটিসিএল ইতোমধ্যে প্রকল্প ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দিয়ে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনে চিঠি দিয়েছে। ঋণের শর্ত সংশোধন ও প্রতিযোগিতা বাড়ানোসহ বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়েছে।
এখন দেখার বিষয়—ব্যয়ের লাগাম টেনে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হবে, নাকি নতুন করে পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করা হবে।সূত্র: প্রথম আলো
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর