প্রকাশের তারিখ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬
মুখোশধারী সন্ত্রাসীদের টার্গেটে বিএনপি নেতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোরতার দাবি
হাবিব সরকার স্বাধীন ||
রাজধানীর বুকে প্রকাশ্যে গুলি: স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মোছাব্বির নিহত, আতঙ্কে নগরবাসীরাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা বসুন্ধরা মার্কেটের পেছনে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মোছাব্বিরকে। বুধবার রাত সোয়া ৮টার দিকে তেজতুরি বাজার এলাকায় মুখোশধারী সন্ত্রাসীদের হামলায় তিনি নিহত হন। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন কারওয়ান বাজার ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সুফিয়ান বেপারি মাসুদ, যিনি বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।ঘটনার পরপরই পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ব্যস্ত সড়কে হঠাৎ গুলির শব্দে সাধারণ মানুষ ছোটাছুটি শুরু করেন। রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ হত্যাকাণ্ড ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ।যেভাবে ঘটল হামলাপুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, রাত আনুমানিক ৮টা ১০ মিনিটে স্টার কাবাবের পাশের একটি গলিতে মোছাব্বির ও তাঁর সহযোগীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে করে এসে মুহূর্তের মধ্যে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়।ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের এডিসি ফজলুল করিম জানান, মোছাব্বিরের পেটে অন্তত তিন রাউন্ড গুলি লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে দ্রুত বিআরবি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।একই ঘটনায় আহত সুফিয়ান মাসুদকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর অবস্থা নিয়ে চিকিৎসকরা এখনো পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।বৈঠকের পরই হামলাস্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার আগে স্টার কাবাবের দোতলায় শরীয়তপুর জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের প্রায় ৪০ জন নেতাকর্মী নিয়ে একটি বৈঠক করেন মোছাব্বির। বৈঠক শেষে অধিকাংশ নেতাকর্মী চলে গেলেও মোছাব্বির কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মীকে নিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন।ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ২৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল মজিদ মিলনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় একটি মাইক্রোবাস এসে থামে। গাড়ি থেকে নেমে লক্ষ্মীপুর বিএনপির এক নেতা মোছাব্বিরের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলেন এবং ওয়াসা অফিসে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন।এর কিছুক্ষণ পরই গুলির ঘটনা ঘটে। বিষয়টি পরিকল্পিত হামলা কি না, সেটি এখন খতিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা।প্রত্যক্ষদর্শীরা যা বলছেনঘটনাস্থলে থাকা কয়েকজন জানান, হঠাৎ পরপর কয়েকটি গুলির শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জোবায়ের হোসেন জাবেদ নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “গুলির শব্দ শুনে দৌড়ে গিয়ে দেখি মানুষ দিগ্বিদিক ছুটছে। সবাই ভয়ে আতঙ্কিত ছিল।”স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও জানিয়েছেন, এত ব্যস্ত এলাকায় এভাবে প্রকাশ্যে গুলি চালানোর ঘটনা মানুষকে নতুন করে নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছে।পরিবারের আহাজারি, বিচার দাবিনিহত মোছাব্বিরের পরিবার এ হত্যাকাণ্ডে গভীর শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। স্বজনদের দাবি, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন।নিহতের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা বলেন, “আমরা এখন ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। যারা এ হত্যাকাণ্ড করেছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।”ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনাএই হত্যাকাণ্ডের পর রাতেই কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারা মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় নেতাকর্মী ও শ্রমিকরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করার ঘটনাকে “ভয়াবহ” ও “গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত” বলে মন্তব্য করেছেন। তারা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকেও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।তদন্তে যা বলছে পুলিশআইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি পূর্বপরিকল্পিত হামলা কি না, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক কোনো বিরোধ ছিল কি না—সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখনো কাউকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো হয়নি।বাড়ছে রাজনৈতিক সহিংসতার শঙ্কাবিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর মতো উচ্চ নিরাপত্তার এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনীতিকে অস্থির করে তুলছে বলেও মত তাদের।তারা মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত বিচার ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত না হলে মানুষের আস্থা আরও কমে যেতে পারে।
রাজধানীর মানুষ এখন একটাই প্রশ্ন তুলছেন—ব্যস্ত নগরীর মাঝখানে যদি এভাবে প্রকাশ্যে গুলি চলে, তাহলে সাধারণ নাগরিক কতটা নিরাপদ?
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর