প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬
সবুজ শ্বেত বামন নক্ষত্রের সন্ধান, মহাকাশ গবেষণায় নতুন আগ্রহ
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
মহাকাশে শ্বেত বামন নক্ষত্রের রং ও রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ব্যতিক্রমী কিছু বৈশিষ্ট্যের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি শ্বেত বামন নক্ষত্রের আলো মানুষের চোখে সবুজ দেখাতে পারে। একই গবেষণায় স্যামন মাছের মতো গোলাপি রঙের আরেকটি নক্ষত্রের বৈশিষ্ট্যও উঠে এসেছে।যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মার্ক হল্যান্ডসের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় পৃথিবীর কাছাকাছি অঞ্চলে থাকা ১৫১টি শ্বেত বামন নক্ষত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটি নক্ষত্রের বর্ণালী, বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক উপাদান এবং সম্ভাব্য রঙের মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে নতুন সূত্র দিয়েছে।শ্বেত বামন নক্ষত্র কেন গুরুত্বপূর্ণ?শ্বেত বামন হলো সূর্যের মতো নক্ষত্রের জীবনচক্রের শেষ পর্যায়ে তৈরি হওয়া অত্যন্ত ঘন অবশিষ্টাংশ। নক্ষত্রের বাইরের স্তর ছড়িয়ে পড়ার পর এর কেন্দ্রীয় অংশ সংকুচিত হয়ে শ্বেত বামনে পরিণত হতে পারে।সাধারণত নক্ষত্রের রং তার পৃষ্ঠের তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে। তবে শ্বেত বামনের ক্ষেত্রে বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক গঠন এবং সেখানে সংঘটিত বিভিন্ন ভৌত প্রক্রিয়াও আলোর বর্ণালীকে প্রভাবিত করতে পারে।গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া মার্ক হল্যান্ডসের মতে, শ্বেত বামনের বায়ুমণ্ডলে থাকা হিলিয়ামের সঙ্গে অন্যান্য উপাদানের মিথস্ক্রিয়া নক্ষত্রগুলোর রঙের পার্থক্য তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। নক্ষত্রগুলো অতীতে যেসব পদার্থের সংস্পর্শে এসেছে, তার ওপর ভিত্তি করেও রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি ও পরিমাণে ভিন্নতা দেখা যায়।১৫১টি নক্ষত্র বিশ্লেষণে মিলল ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যগবেষণায় পৃথিবী থেকে ২০ পারসেক বা প্রায় ৬৫ আলোকবর্ষের মধ্যে থাকা ১৫১টি পরিচিত শ্বেত বামন নক্ষত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।এর মধ্যে একটি ব্যতিক্রমী নক্ষত্রের বর্ণালীতে ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম ও লিথিয়ামের মতো উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নক্ষত্রটির আলো মানুষের চোখে সবুজাভ দেখাতে পারে।তালিকার আরেকটি নক্ষত্রের সম্ভাব্য রং স্যামন মাছের মতো গোলাপি। গবেষক হল্যান্ডসের ভাষ্য অনুযায়ী, নক্ষত্রটিতে কার্বন অণুর উচ্চ ঘনত্বের সঙ্গে এই রঙের সম্পর্ক রয়েছে।তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নক্ষত্রগুলোকে সরাসরি খালি চোখে দেখে রং নির্ধারণ করা হয়নি। তাদের আলোর বর্ণালী বিশ্লেষণ করে মানুষের চোখে সম্ভাব্য রং কেমন দেখাতে পারে, তা হিসাব করা হয়েছে।ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্রহের উপাদানও শনাক্ত করা সম্ভবশ্বেত বামন নক্ষত্রের গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর মাধ্যমে নক্ষত্রের আশপাশে থাকা গ্রহাণু বা পাথুরে মহাজাগতিক বস্তুর রাসায়নিক গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।কোনো গ্রহাণু বা পাথুরে বস্তু শ্বেত বামনের খুব কাছে চলে এলে নক্ষত্রটির মহাকর্ষীয় আকর্ষণে সেটি ভেঙে যেতে পারে। পরে সেই ধ্বংসাবশেষের কিছু অংশ নক্ষত্রের বাইরের স্তরে জমা হতে পারে।এসব ধ্বংসাবশেষে লোহা, ম্যাগনেশিয়াম ও সোডিয়ামের মতো উপাদান থাকতে পারে। নক্ষত্রের বর্ণালীতে এসব উপাদানের উপস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা অতীতে তার আশপাশে থাকা পাথুরে বস্তুর রাসায়নিক গঠন সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান দিয়েগো ক্যাম্পাসের জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যাডাম বারগাসারের মতে, এ ধরনের গবেষণার মাধ্যমে ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্রহের উপাদান ও সেগুলোর আনুপাতিক উপস্থিতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া সম্ভব।তিনি বিষয়টিকে অপরাধস্থলে পড়ে থাকা আলামত বিশ্লেষণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন বিভিন্ন আলামত থেকে কোনো ঘটনার সূত্র পাওয়া যায়, তেমনি শ্বেত বামনের বায়ুমণ্ডলে থাকা রাসায়নিক উপাদান থেকেও অতীতের গ্রহীয় বস্তুর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সূত্র মিলতে পারে।বর্ণালী বিশ্লেষণ করে কীভাবে রং বোঝা যায়?নক্ষত্রের আলোকে তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনুযায়ী বিশ্লেষণ করলে একটি বর্ণালী পাওয়া যায়। এই বর্ণালীতে কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো কতটা উপস্থিত, তা পরীক্ষা করে নক্ষত্রের রাসায়নিক গঠন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।সূর্যের আলো প্রিজমের মধ্য দিয়ে গেলে যেমন বিভিন্ন রঙে বিভক্ত হয়, নক্ষত্রের আলোও যন্ত্রের সাহায্যে বিশ্লেষণ করে তার বর্ণালী তৈরি করা যায়। বর্ণালীর নির্দিষ্ট অংশে আলো শোষিত বা নির্গত হওয়ার ধরন থেকে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব।গবেষণায় অংশ না নেওয়া পেন স্টেট স্ক্র্যান্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী অ্যাগনেস কিম বলেন, সবুজ নক্ষত্র নিয়ে এই গবেষণা হয়তো মহাবিশ্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন কোনো ধারণা দেয় না, তবে শ্বেত বামনকে বোঝার ক্ষেত্রে এটি আকর্ষণীয় একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে।তাঁর মতে, বর্ণালী থেকে নির্ধারিত রং মানুষের চোখে কেমন দেখাতে পারে, তা বিশ্লেষণ করা পদার্থবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের সংযোগস্থলে একটি আকর্ষণীয় গবেষণার বিষয়।ভবিষ্যতে আরও সবুজ নক্ষত্রের সন্ধান মিলতে পারেমার্ক হল্যান্ডস জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে আরও বেশি শ্বেত বামন নক্ষত্রের বর্ণালী বিশ্লেষণের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে অনেক শ্বেত বামন সম্পর্কে জানা থাকলেও সেগুলোর বর্ণালীসংক্রান্ত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।নতুন প্রযুক্তি ও বৃহত্তর বর্ণালীবীক্ষণ জরিপ থেকে তথ্য পাওয়া গেলে বিশ্লেষণযোগ্য নক্ষত্রের সংখ্যা প্রায় ১০ গুণ বাড়তে পারে বলে আশা করছেন গবেষকেরা।হল্যান্ডসের ধারণা, বর্তমানে শনাক্ত করা এক বা দুটি সবুজাভ শ্বেত বামনের মতো বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নক্ষত্রের সংখ্যা ভবিষ্যতে ১০ থেকে ২০টিতে পৌঁছাতে পারে। তবে এটি একটি সম্ভাবনা, নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।এই গবেষণার আকর্ষণ শুধু মহাকাশে ব্যতিক্রমী রঙের নক্ষত্রের সম্ভাব্য সন্ধান নয়। এর আরও গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নক্ষত্রের আলো বিশ্লেষণ করে তার রাসায়নিক গঠন এবং অতীতে আশপাশে থাকা গ্রহীয় বস্তুর ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।তবে সবুজ বা গোলাপি রঙের বিষয়টি বুঝতে হবে গবেষণায় বিশ্লেষণ করা আলোর বর্ণালী ও মানুষের দৃষ্টিশক্তির ভিত্তিতে নির্ধারিত সম্ভাব্য রং হিসেবে। নক্ষত্রগুলোকে পৃথিবী থেকে খালি চোখে সরাসরি ওই রঙে দেখা গেছে—এমন নয়।ভবিষ্যতে আরও বেশি নক্ষত্রের বর্ণালী বিশ্লেষণ করা গেলে শ্বেত বামনের রাসায়নিক বৈচিত্র্য এবং গ্রহের বিবর্তন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর