প্রকাশের তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন, দ্বিতীয় স্ত্রীকে হত্যার পর লাশ ফেলা হয় কর্ণফুলী নদীতে
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে বস্তাবন্দি অবস্থায় এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের প্রায় আড়াই মাস পর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের কথা জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন রাজা মিয়া ওরফে রাজু। বিষয়টি জানার পর দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয় তাঁর। এর জেরে জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে জানিয়েছে পিবিআই।বুধবার (১৪ অক্টোবর) পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন এ তথ্য জানান। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।নিহত জান্নাতুল ফেরদৌসের বয়স ২৮ বছর। তিনি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শিলকূপ ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিলেন এবং একটি জুতার কারখানায় চাকরি করতেন। সাত বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে চান্দগাঁও থানার বাহির সিগন্যালের ব্যাপারীপাড়ায় ভাড়া বাসায় দ্বিতীয় স্বামী রাজুর সঙ্গে থাকতেন তিনি।পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাজুকে বিয়ে করেন জান্নাতুল। বিয়ের সময় রাজু নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। পরে জান্নাতুল জানতে পারেন, রাজুর প্রথম স্ত্রী রয়েছেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।পুলিশের দাবি, একপর্যায়ে জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন রাজু। এ বিষয়ে পূর্বপরিচিত মো. মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে পরামর্শ করেন তিনি।পিবিআই জানায়, রাজু ও মুসলিম উদ্দিন প্রথমে কালুরঘাট সেতু এলাকার এক কবিরাজের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক ও তান্ত্রিক পদ্ধতির আশ্রয় নেন। এতে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় পরে জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজুর প্রথম স্ত্রীর ভাই শুকুর আহম্মদসহ আরও একজনকে যুক্ত করা হয়। তবে অজ্ঞাতপরিচয় ওই ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়নি পিবিআই।পিবিআইয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে বেড়ানোর কথা বলে জান্নাতুলকে কর্ণফুলী নদীর অন্য পাড়ে ব্রিজঘাট এলাকায় নিয়ে যান রাজু।সেখানে আগে থেকেই মুসলিম উদ্দিন, শুকুর আহম্মদ এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরেক ব্যক্তি একটি সাম্পান নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। পরে জান্নাতুলকে নিয়ে তাঁরা নৌকায় ওঠেন। নৌকাটি কর্ণফুলী সেতুর নিচ দিয়ে শিকলবাহা খালে প্রবেশ করে।পুলিশের দাবি, রাত ৮টার পর নৌকায় রাজুর সঙ্গে জান্নাতুলের বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে রাজু তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে খালে ফেলে দেন। এরপর জান্নাতুলের মুখ চেপে ধরা হয় এবং রশি দিয়ে শ্বাসরোধ করে তাঁকে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।পরে জান্নাতুলের হাত-পা বেঁধে বস্তাবন্দি করা হয়। এরপর কর্ণফুলী থানাধীন কালারপোল এলাকায় এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পেছনের অংশে শিকলবাহা খালে মরদেহটি ফেলে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে পিবিআই।পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নৌকাটি নিয়ে ব্রিজঘাট এলাকায় ফিরে যান এবং পরে আত্মগোপনে চলে যান।এরপর ২ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের লঞ্চঘাটসংলগ্ন নদীতে ভাসমান অবস্থায় বস্তাবন্দি এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে সদরঘাট নৌ-পুলিশ। মরদেহটির হাত-পা বাঁধা ছিল।পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি নিখোঁজ জান্নাতুল ফেরদৌসের বলে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় তাঁর মা ছায়রা খাতুন বাদী হয়ে রাজা মিয়া ওরফে রাজু এবং অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে কর্ণফুলী থানায় হত্যা মামলা করেন।গত ৬ অক্টোবর মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো। এরপর পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধানে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক আব্দুর রহিম তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করেন।পিবিআই জানায়, গত ১৩ অক্টোবর টেকনাফ থানা এলাকায় আত্মগোপনে থাকা মো. মুসলিম উদ্দিনকে (৩৯) গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুকুর আহম্মদকে (২৪) গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সাম্পান নৌকাটিও উদ্ধার করে জব্দ করা হয়েছে।পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, ১৪ অক্টোবর মুসলিম উদ্দিন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এতে তিনি নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন বলে জানায় পিবিআই।গ্রেপ্তার শুকুর আহম্মদকে পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান।পিবিআইয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজু ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে অন্য ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তবে রাজু গ্রেপ্তার হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে দেওয়া তথ্যে স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর