প্রকাশের তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬
তৃতীয় এলএনজি টার্মিনালে খরচ বাড়ছে ৩৫–৩৭ শতাংশ, চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব ঘিরে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
বাংলাদেশের প্রস্তাবিত তৃতীয় ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালের রিগ্যাসিফিকেশন সেবার জন্য বর্তমান টার্মিনালগুলোর তুলনায় ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি ফি চেয়েছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিএনইই)। মহেশখালীর কুতুবজোমে ৬০০ থেকে ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট দৈনিক (এমএমসিএফডি) সক্ষমতার টার্মিনাল নির্মাণে প্রতিষ্ঠানটি ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার ফি প্রস্তাব করেছে।প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে টার্মিনাল পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হবে বাংলাদেশকে। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত চুক্তির ধরন—বিল্ড-ওন-অপারেট (বিওও)—নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ এ মডেলে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে টার্মিনালের মালিকানা পেট্রোবাংলার কাছে হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা সাধারণত থাকে না।প্রস্তাবিত দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার ফি বাংলাদেশের বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের রিগ্যাসিফিকেশন ফির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তুলনামূলক হিসাব অনুযায়ী—এক্সিলারেট এনার্জি: দৈনিক ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার।সামিট এলএনজি টার্মিনাল: দৈনিক ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার।সিএনইইর প্রস্তাব: দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার।এই হিসাবে সিএনইইর প্রস্তাবিত ফি এক্সিলারেট এনার্জির তুলনায় প্রায় ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সামিটের তুলনায় প্রায় ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।এ ছাড়া রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) ২০২৫ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দৈনিক ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৩ ডলারের যে বেঞ্চমার্ক হার সুপারিশ করা হয়েছিল, নতুন প্রস্তাবিত ফি তার চেয়েও বেশি।তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাবটি বিওও মডেলে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এই কাঠামোয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়ন বা ব্যবস্থাপনায় অবকাঠামো নির্মাণ করে এবং তা পরিচালনা করে। চুক্তিতে আলাদা কোনো শর্ত না থাকলে মেয়াদ শেষে সম্পদের মালিকানা হস্তান্তর বাধ্যতামূলক হয় না।অন্যদিকে, আগের কিছু প্রস্তাবিত টার্মিনাল প্রকল্পে বিল্ড-ওন-অপারেট-ট্রান্সফার (বিওওটি) মডেল অনুসরণ করার কথা ছিল। এ মডেলে নির্ধারিত সময় শেষে টার্মিনালের মালিকানা পেট্রোবাংলার কাছে বিনা মূল্যে হস্তান্তরের শর্ত রাখা হয়েছিল।ফলে শুধু দৈনিক ফি নয়, চুক্তির মেয়াদ শেষে টার্মিনাল ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর মালিকানা কার হাতে থাকবে—সেটিও ব্যয়ের দীর্ঘমেয়াদি হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।প্রতিবেদন অনুযায়ী, দরকষাকষির বিভিন্ন পর্যায়ে সিএনইই তাদের প্রাথমিক প্রস্তাব দৈনিক ৩ লাখ ৫৪ হাজার ১৭৪ ডলার থেকে কমিয়ে আনে।পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নানের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের দরকষাকষি কমিটি সরকারের কাছে দুটি বিকল্প সুপারিশ করেছে:১৫ বছর মেয়াদে দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার।২০ বছর মেয়াদে দৈনিক ৩ লাখ ২৯ হাজার ডলার।প্রতিবেদনে ১৫ বছর মেয়াদি প্রস্তাবের মোট আর্থিক বাধ্যবাধকতা প্রায় ১২ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।তবে চূড়ান্ত চুক্তির মেয়াদ, অর্থ পরিশোধের শর্ত এবং প্রস্তাবটি সরকার অনুমোদন করেছে কি না—এসব বিষয় আলাদাভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।সামিটের দ্বিতীয় এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্পটি আগে বিওওটি মডেলে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামিট চুক্তিটি পুনর্বহালের অনুরোধ জানিয়েছে।সামিটের দাবি, তাদের প্রস্তাবিত প্রকল্প চালু হলে ১৫ বছর পর ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ), মুরিং ব্যবস্থা এবং সমুদ্রতলের পাইপলাইনের মালিকানা বিনা মূল্যে পেট্রোবাংলার কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হতো।পেট্রোবাংলাকে পাঠানো সাম্প্রতিক চিঠিতে দৈনিক ফির পার্থক্য তুলে ধরে সামিট জানিয়েছে, শুধু রিগ্যাসিফিকেশন ফি খাতেই ১৫ বছরে ২৩ কোটি মার্কিন ডলার সাশ্রয় সম্ভব।এটি সামিটের নিজস্ব দাবি। প্রস্তাব দুটি তুলনা করতে হলে টার্মিনালের সক্ষমতা, পরিচালন ব্যয়, নির্মাণের সময়, চুক্তির শর্ত ও মেয়াদ শেষে সম্পদের মূল্য—সবকিছু একই ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।সিএনইই আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং জাহাজ নির্মাণসামগ্রীর উচ্চমূল্যকে বাড়তি ফির কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এত বড় ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং বিকল্প প্রস্তাবের তুলনামূলক বিশ্লেষণ জরুরি। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি এগিয়ে নেওয়া এবং ১৮ মাসের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।তাঁদের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, শুধু দ্রুত টার্মিনাল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি নয়—প্রস্তাবিত ব্যয় যৌক্তিক কি না, নির্মাণের সময়সীমা বাস্তবসম্মত কি না এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের আর্থিক স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে, তা যাচাই করা প্রয়োজন।বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এলএনজি সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে চাপের মধ্যেই নতুন টার্মিনালের প্রস্তাব সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কাতার এনার্জি ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে।এ পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরে এলএনজি ভর্তুকি বেড়ে ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে।দেশের গ্যাসের চাহিদা মেটাতে নতুন টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এর জন্য উচ্চ রিগ্যাসিফিকেশন ফি নির্ধারণ করা হলে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকির ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা হিসাব করা জরুরি।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর