প্রকাশের তারিখ : ১১ অক্টোবর ২০২৬
মেগা প্রকল্প নয়, মর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মানেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: রিয়াজ হামিদুল্লাহ
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে বড় প্রকল্প, রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা কিংবা কেবল নিরাপত্তার দৃষ্টিভঙ্গিতে সীমাবদ্ধ না রেখে পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান ও সাধারণ মানুষের স্বার্থের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতে বাংলাদেশের সদ্য বিদায়ী হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ।ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা বন্ধ করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা এবং একে অপরের উদ্বেগ ও দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা জরুরি।তাঁর মতে, কোটি ডলারের মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি এমন উদ্যোগকে গুরুত্ব দিতে হবে, যা দুই দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।রিয়াজ হামিদুল্লাহ বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ঐতিহ্যগতভাবে বাণিজ্য, রাষ্ট্রীয় সফর ও আনুষ্ঠানিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়। তবে প্রযুক্তির বিকাশ ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের কারণে দুই দেশের জনমিতি এবং তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।তিনি উল্লেখ করেন, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দেওয়া চিঠিতে মর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান ও যৌথ সুবিধার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।হাইকমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দেশের সম্পর্কের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোই হওয়া উচিত সহযোগিতার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সংবেদনশীলতা রক্ষায় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকার ওপর জোর দেন রিয়াজ হামিদুল্লাহ।সাক্ষাৎকারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন উসকানিমূলক রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য দুই দেশের মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে।তাঁর মতে, মুখরোচক বা উসকানিমূলক খবরের পেছনে না ছুটে এমনভাবে তথ্য পরিবেশন করা প্রয়োজন, যাতে দুই দেশের মানুষের মধ্যকার স্বাভাবিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।বাংলাদেশের নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম মাসের মধ্যেই দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনা শুরু হয়েছিল বলে জানান বিদায়ী হাইকমিশনার।তিনি বলেন, ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়ে বাংলাদেশ যেমন সংবেদনশীল, তেমনি বাংলাদেশের উদ্বেগ ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও ভারতকে বিবেচনায় নিতে হবে।তাঁর মতে, একে অপরের অবস্থান বোঝার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে আরও স্বস্তিদায়ক ও আস্থাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহকে প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসস্তূপ ও অমানবিকতার সময় হিসেবে বর্ণনা করেন রিয়াজ হামিদুল্লাহ। তাঁর বক্তব্য, ওই সময়ে সাধারণ মানুষের ওপর সংঘটিত সহিংসতার চিত্র ভারতীয় গণমাধ্যমে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে জমে ওঠা ক্ষোভের গভীরতা বুঝতে ভারতীয় পর্যবেক্ষকদের বাংলাদেশের মানুষের অবস্থান থেকে ঘটনাগুলো বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে যেকোনো বিষয়ে পূর্বশর্ত ছাড়াই খোলামেলা আলোচনা করতে প্রস্তুত রয়েছে বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসন।সাক্ষাৎকারে দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের প্রসঙ্গও উঠে আসে।রিয়াজ হামিদুল্লাহর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হিসাবে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার হলেও বৃহত্তর অর্থনৈতিক যোগাযোগের আকার ২৮ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।ভারতে বাংলাদেশিদের চিকিৎসা নিতে যাওয়া এবং বাংলাদেশ থেকে ভারতে অর্থ পাঠানোর মতো বিষয়কে বৃহত্তর অর্থনৈতিক যোগাযোগের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।এ ক্ষেত্রে শুধু নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে ভিসা ব্যবস্থা ও মানুষের যাতায়াত সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেন বিদায়ী হাইকমিশনার।তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে।আগামী ডিসেম্বরে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং তা নবায়নের প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন রিয়াজ হামিদুল্লাহ।তিনি বলেন, পানি কেবল গাণিতিক হিসাব বা অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি সংস্কৃতি, পরিচয় ও পরিবেশেরও অংশ।তাঁর মতে, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার পানি প্রবাহের হিসাবের পাশাপাশি নদীর পলি, বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশগত বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজা প্রয়োজন।বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাত ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আওতায় নিজস্ব লক্ষ্য ও বৈচিত্র্যকরণের নীতিতে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানান রিয়াজ হামিদুল্লাহ।তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের সামরিক বাহিনীর মধ্যে পেশাদার সম্পর্ক সুদৃঢ় ও নির্বিঘ্ন বলেও মন্তব্য করেন।পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের গণহত্যার ইতিহাস মনে রেখেই বৈশ্বিক কূটনীতির নীতি অনুসারে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর