প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬
বায়রার অনুমোদনের অপেক্ষা, উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে রূপপুরের প্রথম ইউনিট
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভের (পিওআরভি/পিওএসভি) গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এখন ইউনিটটির ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ বা প্রথম স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন শুরুর জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়রা) অনুমোদনের অপেক্ষা রয়েছে।প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে আগামী ডিসেম্বরের শেষে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ তৈরি হতে পারে।নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথম ধাপে ১৬ দশমিক ১ এমপিএ পরিচালন চাপ এবং ২৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রেখে ১২টি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়।পরবর্তী ধাপে ১৮ দশমিক ৬৫ এমপিএ চাপে ভালভের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার শুরুতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভালভ একসঙ্গে খুলতে কিছুটা সমস্যা দেখা দেয়। পরে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।এ ছাড়া ১৮ দশমিক ১ এমপিএ চাপে তিনটি ভালভের প্রথমটি খুলে অতিরিক্ত চাপ নির্গত করার পরীক্ষাও সফল হয়েছে।এর আগে ভালভে সমস্যা দেখা দেওয়ার পর তা মেরামতে রাশিয়ার সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ। পরে রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল রূপপুরে এসে নয়টি ভালভ মেরামত করে।মেরামত শেষে ধাপে ধাপে ভালভগুলোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। এসব পরীক্ষায় ভালভ খোলা ও বন্ধ হওয়ার সময়, সাড়া দেওয়ার গতি, সতর্কসংকেত এবং প্রয়োজনীয় চাপ ও তাপমাত্রার তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ (এমসিআর) এবং জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষ (ইসিআর)—দুই জায়গা থেকেই পরীক্ষাগুলো পরিচালনা করা হয়েছে।রূপপুরের প্রথম ইউনিটের জন্য এখন বড় মাইলফলক হলো ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরে একটি স্থিতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হবে।এ জন্য বায়রার অনুমোদন প্রয়োজন। অনুমোদনের পর রিঅ্যাক্টরকে প্রাথমিকভাবে খুব কম শক্তিস্তরে পরিচালনা করে ‘ইনিশিয়াল ক্রিটিক্যালিটি’ পর্যায়ে নেওয়া হবে।এ সময় রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ পরামিতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন সিস্টেমের কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটিসহ পুরো ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে। পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক হলে ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো হবে।ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ শেষ হওয়ার পর প্রথম ইউনিট ‘পাওয়ার স্টার্ট-আপ’ পর্যায়ে যাবে। এ সময় ধীরে ধীরে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো, টারবাইন সিনক্রোনাইজেশন এবং জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করার কার্যক্রম পরিচালিত হবে।এ পর্যায়ে অপারেটিং সংস্থাকে বায়রার কাছ থেকে ট্রায়াল অপারেশনাল লাইসেন্স নিতে হবে।প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে নিরাপদভাবে সংযুক্ত করে শুরুতে কম মাত্রায় উৎপাদন করা হবে। পরে ধাপে ধাপে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো হবে। গ্রিডে সংযোগের পরও কয়েক মাস পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলতে পারে।পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন শুরুর প্রক্রিয়ায় শুধু কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিই যথেষ্ট নয়। রিঅ্যাক্টর, টারবাইন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গেও কঠোর সমন্বয় প্রয়োজন।এ ক্ষেত্রে বায়রা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড-সংশ্লিষ্ট সংস্থা, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, নিউক্লিয়ার ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা রয়েছে।তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে।রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের মেয়াদ প্রথমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। পরে দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ নেই। তবে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।বর্তমানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।রূপপুরের প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করতে পারলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় নতুন একটি উৎস যুক্ত হবে। একই সঙ্গে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো জটিল প্রযুক্তি পরিচালনায় বাংলাদেশের সক্ষমতাও বাস্তবে পরীক্ষিত হবে।তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে শুধু দ্রুত উৎপাদন শুরু করাই মূল লক্ষ্য নয়। নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড, দক্ষ জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর