প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬
ডেঙ্গুর ধরন বদলেছে, সামান্য জ্বরেও বাড়ছে শকে যাওয়ার ঝুঁকি
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছেই। কোথাও বেডের সংকট, আবার কোথাও মেঝেতে বিছানা পেতে চলছে চিকিৎসা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।এর মধ্যে চিকিৎসকেরা বলছেন, ডেঙ্গুর প্রকাশভঙ্গিতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে আগের মতো তীব্র জ্বর, শরীরে র্যাশ বা অন্যান্য পরিচিত লক্ষণ স্পষ্ট থাকছে না। সামান্য জ্বর-সর্দি ভেবে অনেকে চিকিৎসা নিতে দেরি করছেন। পরে হঠাৎ অবস্থার অবনতি হয়ে রোগী শকে চলে যাচ্ছে।ফলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, জ্বর সামান্য হলেও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি ও সন্দেহজনক ক্ষেত্রে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগস্ট মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন। সেপ্টেম্বরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩ হাজার ৭৭৪ জনে—অর্থাৎ এক মাসে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।মৃত্যুর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। আগস্টে ডেঙ্গুতে ৪৩ জনের মৃত্যু হলেও সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৮ জনে।অক্টোবরের প্রথম চার দিনেও পরিস্থিতির উন্নতির স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। এই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৮৩৮ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গুর আচরণে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর প্রচলিত লক্ষণগুলো স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাচ্ছে না।তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১০১ বা ১০২ ডিগ্রি জ্বর হলেও ডেঙ্গু হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রার জ্বর বা শরীরে র্যাশও থাকে না। ফলে রোগী ও পরিবারের সদস্যরা সাধারণ সর্দি-জ্বর ভেবে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারেন।এরপর হঠাৎ রোগীর অবস্থার অবনতি হয়ে শকের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। দেরিতে হাসপাতালে আসায় তখন চিকিৎসকদের জন্যও রোগীকে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, সামান্য জ্বর, সর্দি বা কাশি হলেও পরিস্থিতি বুঝে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো উচিত। দ্রুত রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চললে জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বিশেষ করে আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং ক্যানসার, হৃদ্রোগ, কিডনি বা অন্যান্য জটিল রোগে ভুগছেন—এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির জ্বর হলে শুধু জ্বর কমানোর দিকে নজর না দিয়ে রোগের কারণ শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ।ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ বেড়েছে। কিছু হাসপাতালে বেডের সংকট তৈরি হওয়ায় মেঝেতেও রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৮৯ জন।এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা ২৬২ জনে এবং মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৮৬ হাজার ৪৫৮ জনে দাঁড়িয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।এদিকে ডেঙ্গুর চিকিৎসায় বিশ্বে কার্যকর কোনো ওষুধ থাকলে তা দেশে সহজলভ্য করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।রোববার রাজধানীর মগবাজারের মধুবাগে দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।তিনি বলেন, ডেঙ্গুকে মহামারির মতো গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকারিভাবে টিকা বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ আনার মতো পর্যাপ্ত তহবিল না থাকলে বেসরকারি খাতের জন্য বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।তার বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষের জীবন বাঁচাতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ ও ওষুধ সহজলভ্য করা জরুরি।৪ থেকে ১০ অক্টোবর ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা সপ্তাহ পালন করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।ডেঙ্গুর পাশাপাশি দেশে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গ নিয়েও রোগীর চাপ রয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য থেকে জানা গেছে।গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩০০ জন এবং মারা গেছেন আরও তিন শিশু।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এ সময়ে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২১৮ জন এবং নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৮২ জন।গত মার্চ থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ১০২ জন এবং সন্দেহজনক হামে ১০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্তের সংখ্যা ২১ হাজার ৭৪৮ জন এবং হামসদৃশ উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৯৬ হাজার ৪১৮ জন। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৭৪ হাজার ১৪৯ জন; এর মধ্যে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯০৮ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর