প্রকাশের তারিখ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সেনা প্রত্যাহার করলেও ইরাকের তেল রাজস্বে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের পর ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শেষের দিকে। ইরান ও তাদের মিত্ররা এই ঘটনাকে নিজেদের জন্য একটি সাফল্য হিসেবে দেখছে। কিন্তু সামরিক উপস্থিতি কমে গেলেও ইরাকের অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না।এর অন্যতম বড় কারণ দেশটির তেল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা। ইরাকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস তেল। আর সেই তেল বিক্রির অর্থ দীর্ঘদিন ধরে নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংককেন্দ্রিক একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে।অর্থাৎ, ইরাকের মাটিতে মার্কিন সেনার উপস্থিতি কমলেও দেশটির অর্থনীতি, ডলার সরবরাহ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ওয়াশিংটনের প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো এখনও রয়ে গেছে।কীভাবে শুরু হয়েছিল তেল রাজস্বের এই ব্যবস্থা২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের পর ‘কোয়ালিশন প্রভিশনাল অথরিটি’ (সিপিএ) ‘ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর ইরাক’ (ডিএফআই) প্রতিষ্ঠা করে।নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে রাখা এই তহবিলের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ সংরক্ষণ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির পুনর্গঠন ও উন্নয়নকাজে সেই অর্থ ব্যবহার করা।পাশাপাশি সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলের বিভিন্ন মামলা, ক্ষতিপূরণ ও পাওনা দাবির হাত থেকে ইরাকের রাজস্ব সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থাও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা চালু হয়। পরবর্তী মার্কিন প্রশাসনগুলোও বিভিন্ন সময়ে তা নবায়ন করেছে।পরবর্তীতে ডিএফআই কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে নিউ ইয়র্ক ফেডে ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হয়। সেই আর্থিক কাঠামোর প্রভাব এখনও ইরাকের তেল রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ।তেলের ওপর নির্ভরশীল ইরাক, তাই অর্থের নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণইরাকের অর্থনীতিতে তেল খাতের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। দেশটির জাতীয় বাজেটের বড় অংশই তেল বিক্রির রাজস্ব থেকে আসে। ফলে এই অর্থ কীভাবে সংরক্ষিত, স্থানান্তরিত ও ব্যবহার করা হবে—তা সরাসরি দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত।২০২০ সালে ইরাক সরকার মার্কিন সেনাদের দেশ থেকে প্রত্যাহারের দাবি তুললে নিউ ইয়র্ক ফেডে থাকা ইরাকি তহবিলে প্রবেশাধিকার নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা অর্থনৈতিক চাপের আশঙ্কা ইরাকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।শেষ পর্যন্ত বাগদাদকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্কের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়।তবে ২০০৩ সালের পরের সময়ের তুলনায় ইরাক বর্তমানে নিজেদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আগের চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব বাড়ানোর চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি।কেন ইরাক এখনও এই ব্যবস্থা ধরে রেখেছেইরাকের কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, নাম প্রকাশ না করার শর্তে, বর্তমান ব্যবস্থাটি দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সরকারি তহবিলের নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখে।তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নিউ ইয়র্ক ফেডকেন্দ্রিক এই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থা বাড়াতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্য, আমদানি এবং প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলার সংগ্রহের ক্ষেত্রেও এটি সুবিধা তৈরি করে।এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের দাবি, মামলা ও অন্যান্য আর্থিক ঝুঁকি থেকে তেল রাজস্ব সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রেও ব্যবস্থাটি কার্যকর বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।দিনারের বিনিময় হার ও দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা রয়েছে বলে তারা মনে করেন।অর্থাৎ, ইরাকের জন্য বিষয়টি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মেনে নেওয়ার প্রশ্ন নয়; বিদ্যমান ব্যবস্থার কিছু অর্থনৈতিক সুবিধাও রয়েছে বলে দেশটির কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।ডলার নিয়ন্ত্রণে তৈরি হয়েছে নতুন সংকটতবে এই ব্যবস্থার নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও আলোচনা রয়েছে।ইরাকে বৈধ ও আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে ডলার সরবরাহের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ফলে একটি সমান্তরাল অনানুষ্ঠানিক বাজার গড়ে উঠেছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত বিনিময় হার এবং খোলাবাজারের ডলারের দামের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে।ইরাকের অর্থনীতিতে ডলারের গুরুত্ব বেশি হওয়ায় এই ব্যবধান সাধারণ ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আমদানির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরাকি আর্থিক ব্যবস্থার কিছু অংশ ব্যবহার করে ইরান ও নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা বিভিন্ন পক্ষের কাছে অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে।এই অভিযোগের পর ওয়াশিংটন ইরাকের কয়েকটি ব্যাংক ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বে মাঝখানে ইরাকইরাকের জন্য সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটি হলো ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ক।ইরানের সঙ্গে ইরাকের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গভীর। আবার ২০০৩ সালের পর থেকে ইরাকের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ।ফলে দুই দেশের টানাপোড়েন বাড়লে বাগদাদকে প্রায়ই কঠিন ভারসাম্যের মধ্যে পড়তে হয়।বিশেষ করে ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির কারণে ইরাকের ব্যাংকিং ও ডলার ব্যবস্থাপনা আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকি আর্থিক ব্যবস্থার ওপরও নজরদারি বাড়িয়েছে—এমন অভিযোগ ও প্রতিবেদন বিভিন্ন সময়ে এসেছে।ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘদিন স্থানীয় বাজারে ডলার সরবরাহের জন্য ‘ডলার নিলাম’ বা ‘ফরেন কারেন্সি উইন্ডো’ ব্যবস্থা পরিচালনা করত।এই ব্যবস্থায় বেসরকারি ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলো দিনার জমা দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার সংগ্রহ করতে পারত।তবে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ তোলে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানসহ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা বিভিন্ন পক্ষের কাছে ডলার পাচার করা হচ্ছে।ওয়াশিংটনের চাপের মধ্যে ইরাক ২০২৫ সালের শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোনো ডলার নিলাম ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। এরপর দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোর নিয়ম চালু করা হয়।ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। তবে সামরিক উপস্থিতি কমে যাওয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক-সংক্রান্ত প্রভাবের সম্পূর্ণ অবসান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।নিরাপত্তা ও সামরিক উপস্থিতির পাশাপাশি অর্থনীতি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ডলার প্রবাহ এবং তেল রাজস্ব ব্যবস্থাপনাও একটি দেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।ইরাকের ক্ষেত্রে এই আর্থিক সম্পর্কই দেখিয়ে দেয়—একটি দেশের মাটিতে সেনা উপস্থিতি না থাকলেও অর্থনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বজায় থাকতে পারে।ইরাকের সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তেল থেকে পাওয়া বিপুল অর্থ কতটা স্বচ্ছভাবে এবং কার্যকরভাবে দেশের উন্নয়নে ব্যবহার হচ্ছে।একদিকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থা, ডলার সরবরাহ ও রাজস্ব সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের নিজস্ব তেল রাজস্বের ওপর কতটা স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ থাকবে, সেটিও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।ইরাকের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ হলো—আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও নিজেদের ব্যাংকিং কাঠামো ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কতটা স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায়।ইরাকের বর্তমান পরিস্থিতি দেখায়, যুদ্ধ শেষ হওয়া বা বিদেশি সেনা প্রত্যাহার করাই কোনো দেশের ওপর বাইরের প্রভাবের শেষ ধাপ নয়। অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রা এবং জ্বালানি রাজস্বের মতো ক্ষেত্রগুলো অনেক সময় সামরিক উপস্থিতির চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব তৈরি করতে পারে।তবে একই সঙ্গে এটিও গুরুত্বপূর্ণ যে, নিউ ইয়র্ক ফেডের মাধ্যমে ইরাকি তেল রাজস্বের ব্যবস্থাপনা পুরো অর্থেই ‘যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানা’ বোঝায় না। ইরাকের নিজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এই অর্থ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত। তাই বিষয়টিকে সরাসরি ‘ইরাকের তেল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে’ হিসেবে দেখার বদলে ইরাকের তেল রাজস্বের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও নিয়ন্ত্রণমূলক প্রভাব হিসেবে বোঝা বেশি যথাযথ।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর