প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এডিবির পূর্বাভাসে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমে ৪ শতাংশ, বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতি
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একসঙ্গে দুই ধরনের চাপের ইঙ্গিত দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটি চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ শতাংশে নামিয়েছে। একই সঙ্গে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে ওঠার পূর্বাভাস দিয়েছে।এর আগে জুলাইয়ে এডিবি বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত সংস্থাটির ফ্ল্যাগশিপ প্রকাশনা ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক’ (এডিও)-এর সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে নতুন পূর্বাভাস দেওয়া হয়।এডিবির মতে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির ওপর সবচেয়ে বড় চাপগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি।সংস্থাটি বলছে, উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক ব্যালান্সশিট ও ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছে না। এর সঙ্গে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি এড়িয়ে সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগের প্রবণতাও বেসরকারি ঋণপ্রবাহকে সীমিত করছে।এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। এডিবির পর্যালোচনায় দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যিক প্রতিকূলতা, জ্বালানি আমদানিতে অস্থিরতা এবং আবহাওয়াজনিত দুর্যোগকেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানোর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।শিল্প খাত নিয়ে এডিবির পূর্বাভাসও সতর্কতামূলক। সংস্থাটির হিসাবে, চলতি অর্থবছরে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে।নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির অভাব, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তাকে এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।অন্যদিকে অনিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ, লজিস্টিক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক অনুমোদন প্রক্রিয়াও নতুন বিনিয়োগে বাধা তৈরি করছে বলে মনে করছে এডিবি।এ অবস্থায় অর্থনীতিকে চাঙা করতে মুদ্রানীতি শিথিল করা বা রাজস্ব প্রণোদনা দেওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব এবং সারের সীমিত সরবরাহের কারণে কৃষি খাতও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে জানিয়েছে এডিবি।তবে সেবা খাত কিছুটা স্থিতিশীল থাকতে পারে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর ভর করে চলতি অর্থবছরে সেবা খাতে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।অর্থনীতির চাহিদার দিক থেকে বেসরকারি ভোগব্যয়ই প্রধান চালিকাশক্তি থাকবে বলে মনে করছে এডিবি। রেমিট্যান্স এতে সহায়তা করলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়েও সতর্ক করেছে এডিবি। সংস্থাটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। জুলাইয়ে দেওয়া পূর্বাভাসে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। গত অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ।এডিবির মতে, জ্বালানি ঘাটতি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন এবং আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে এল নিনোর বিলম্বিত প্রভাবও খাদ্য ও পণ্যের দামে প্রভাব ফেলতে পারে।সম্প্রতি দেশে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের দাম বাড়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব বাজারদরেও পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কম থাকা এবং ঋণপ্রবাহ দুর্বল হওয়ায় চাহিদাভিত্তিক মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকতে পারে বলে মনে করছে এডিবি।উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি সংকট এবং ব্যবসায়ীদের আস্থার ঘাটতির কারণে বেসরকারি বিনিয়োগে দুর্বলতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি।সরকারি বিনিয়োগেও বড় অবদান আসার সুযোগ সীমিত হতে পারে। এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং রাজস্ব ঘাটতিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।রপ্তানি আয় বিশ্ববাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে ধীরগতিতে পুনরুদ্ধার হতে পারে। তবে জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির চাহিদা বাড়লে সামগ্রিক আমদানি ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ কীপ্রবৃদ্ধি কমলে নতুন কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির গতি ধীর হওয়ার ঝুঁকি থাকে।জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্য ও খাদ্যের দাম আরও চাপে পড়তে পারে।উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণকে কঠিন করে তুলতে পারে।এডিবির নতুন পূর্বাভাসে বাংলাদেশের অর্থনীতির দুটি বিপরীত চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—একদিকে প্রবৃদ্ধির গতি কমার আশঙ্কা, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি। অর্থাৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল থাকলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমছে না।এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিনিয়োগের প্রশাসনিক বাধা কমানো এবং সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ নয়, একই সঙ্গে উৎপাদন ও বিনিয়োগের গতি ফিরিয়ে আনাও অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর