প্রকাশের তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশে আট মাসে ৩৬ নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার, উদ্বেগ বাড়াচ্ছে শিশুদের নিরাপত্তা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। একই সময়ে শিশু হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণের পর হত্যা এবং পারিবারিক সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনাও সামনে এসেছে। এসব তথ্য শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা নিজেরাই ফিরে এসেছে।তবে নিখোঁজ হওয়ার পর যেসব শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, সেসব ঘটনা শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সামাজিক জবাবদিহি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করছে।বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে শিশুদের ওপর সহিংসতার পরিসংখ্যান তৈরি করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংগঠনটির হিসাবে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।এ ছাড়া একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের ঘটনায় মোট ১৫৫ শিশু নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক নির্যাতন, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতন, ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা, গুলিতে নিহত হওয়া এবং অপহরণের পর হত্যার ঘটনা।আসকের পরিসংখ্যান গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। ফলে সব ঘটনা এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না, তা নির্ভর করছে প্রকাশিত সংবাদ ও প্রাপ্ত তথ্যের ওপর।সম্প্রতি কুমিল্লায় নিখোঁজের পর ১৩ বছর বয়সী শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর সামনে আসে। এর আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিখোঁজ শিশুদের কাউকে মাটিচাপা অবস্থায়, আবার কাউকে নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।১০ সেপ্টেম্বর জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছরের একটি শিশু বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর আর বাড়ি ফেরেনি। পরে ১২ সেপ্টেম্বর তার এক সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় শিশুটির মরদেহ পাওয়া যায়।পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ওই শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।তবে মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে চূড়ান্তভাবে অপরাধী বলা যায় না।আসকের হিসাবে, বছরের প্রথম আট মাসে শিশু নিহত হওয়ার ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—শারীরিক নির্যাতনে নিহত: ৬৮ জনপারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে নিহত: ৪৯ জনধর্ষণের পর হত্যা: ২৬ জনধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা: ৪ জনগুলিতে নিহত: ৩ জনগৃহকর্মী হিসেবে শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু: ২ জনউত্ত্যক্তকারীর হাতে হত্যা: ২ জনঅপহরণের পর হত্যা: ১ জনএ ছাড়া আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু এবং মরদেহ উদ্ধারের ৯৯টি ঘটনার তথ্যও উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।প্রতিটি শ্রেণির মধ্যে কিছু ঘটনার ধরন পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের সময় ঘটনার শ্রেণিবিন্যাস ও উৎস বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।গণমাধ্যমে প্রকাশিত চারটি ঘটনায় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সাত শিশুর নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে এক পরিবারের মা ও তিন মেয়েকে হত্যা করা হয়। নিহত তিন মেয়ের মধ্যে সিপার বয়স ছিল ১০ বছর, ইকরা ১৭ বছর এবং সাইমা আক্তারের বয়স ২১ বছর।আগস্টে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে ১২ বছরের ছেলে আয়ুশও নিহত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।এ ছাড়া মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের পাঁচ দিন পর নদী থেকে তাঁর এক বছর বয়সী সন্তানের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়।সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ১৮ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে একই পরিবারের ১০, ৭ ও ২ বছর বয়সী তিন শিশু নিহত হওয়ার ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনা নিয়ে তদন্তের ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে দেশে ২ হাজার ৩৬২টি হত্যা মামলা হয়েছে। এই হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৯৫টি হত্যা মামলা হয়েছে।তবে মোট হত্যা মামলার সংখ্যা থেকে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের নির্দিষ্ট চিত্র আলাদাভাবে বোঝা যায় না। শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে কার্যকর পরিকল্পনা করতে হলে বয়স, অপরাধের ধরন, স্থান, অপরাধীর সঙ্গে সম্পর্ক এবং তদন্তের অগ্রগতির মতো তথ্য আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।২২ মে বাংলাদেশে শিশুদের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ইউনিসেফ। সংস্থাটির তৎকালীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এসব ঘটনায় দায়মুক্তির অবসান এবং ঘর, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রতিটি পর্যায়ে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।শিশুদের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় সুরক্ষা সেবা এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তার ঘাটতি দূর করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।স্কুল, মাদ্রাসা ও কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয় সংস্থাটির বক্তব্যে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, শিশুদের বিরুদ্ধে এ ধরনের সহিংসতা সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, ঘর, খেলার মাঠ, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যাওয়া কিংবা পরিবারের সঙ্গে থাকা—কোনো ক্ষেত্রেই শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চয়তার অভাব থাকা উচিত নয়।তিনি উল্লেখ করেন, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার পেছনে অপরাধীদের মানসিকতা, প্রতিশোধ, পারিবারিক বিরোধ এবং বড়দের দ্বন্দ্বের প্রভাব থাকতে পারে। অনেক সময় শিশুরা বড়দের বিরোধের শিকার হয়।অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। তাঁর মতে, জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে এবং এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখা সম্ভব।গুরুত্বপূর্ণ দিকজানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের জিডি হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশু উদ্ধার হয়েছে অথবা ফিরে এসেছে।আসকের হিসাবে জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় মোট ১৫৫ শিশু নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।শিশুদের নিরাপত্তায় শিশুবান্ধব পুলিশ, বিচারপ্রক্রিয়া ও স্থানীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।শিশু নিখোঁজ হওয়ার প্রতিটি ঘটনা পরিবারের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। নিখোঁজ শিশুর দ্রুত সন্ধান, অভিযোগ গ্রহণে পুলিশের সক্রিয়তা এবং তদন্তের অগ্রগতি নিশ্চিত করা গেলে অনেক ঝুঁকি কমানো সম্ভব।শিশুদের নিরাপত্তা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়। বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, পরিবহনব্যবস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সমাজের প্রত্যেক স্তরের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।একই সঙ্গে শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা বজায় রাখা জরুরি। নিখোঁজ, উদ্ধার, হত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু এবং অন্যান্য ঘটনার তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা হলে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা সহজ হবে।নিখোঁজের অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ: শিশুর নিখোঁজের পর অপেক্ষা না করে দ্রুত জিডি ও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।শিশুবান্ধব পুলিশি ব্যবস্থা: শিশু ও পরিবারের সঙ্গে সংবেদনশীল আচরণ এবং দ্রুত অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা।স্কুল-মাদ্রাসায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা: প্রবেশ ও বের হওয়ার তথ্য সংরক্ষণ, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং দায়িত্বশীল তদারকি নিশ্চিত করা।স্থানীয় সুরক্ষা নেটওয়ার্ক: জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা: অপরাধের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা।শিশু নিখোঁজ ও নিহত হওয়ার পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়—প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি অসম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শুধু ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয়; নিখোঁজের শুরুতেই দ্রুত অনুসন্ধান, ঝুঁকি শনাক্তকরণ, সামাজিক নজরদারি এবং কার্যকর জবাবদিহি প্রয়োজন।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর