প্রকাশের তারিখ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তীব্র গরমে দেশজুড়ে লোডশেডিং, রাজধানীতেও বাড়ছে বিদ্যুৎ সংকট
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
তীব্র গরমে দিনে-রাতে দেশজুড়ে চলছে লোডশেডিং। এবার শুধু গ্রামাঞ্চল নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতেও নিয়মিত বিদ্যুৎ যাচ্ছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার পাশাপাশি এবার জ্বালানি সংকটও তীব্র। এলএনজি, কয়লা ও তেল সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও টার্মিনালের বিভিন্ন সমস্যাও সরবরাহে প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি কঠিন।
প্রতি বছর গরমের সময় বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং করে শহর ও শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এবার রাজধানীতেও এর প্রভাব স্পষ্ট।
বাড্ডা, খিলগাঁও, তেজগাঁও, মগবাজার, মোহাম্মদপুর ও শ্যামলীসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনে-রাতে নিয়মিত লোডশেডিংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে।
এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। একজন ভুক্তভোগীর ভাষায়, সন্তানদের পড়তে বসানোর সময়ই বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। আবার কখনো সন্ধ্যার পর, কখনো রাত ১০টা-১১টার পর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে রাখা পণ্য, এমনকি আইসক্রিমও নষ্ট হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
জেনারেটর চালানোর সামর্থ্য না থাকায় ছোট ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
পিডিবির তথ্য বলছে, গত ১০ আগস্ট রাত ১টায় দেশে লোডশেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট, যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর প্রায় এক মাস পর, ১০ সেপ্টেম্বর লোডশেডিং ছিল প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট। ওই দিন আদানি পাওয়ারের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ সরবরাহও প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছিল।
এদিকে পিক আওয়ারে কোনো কোনো দিন বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে বলে পিডিবির তথ্যের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত চাহিদা এর চেয়েও বেশি হতে পারে।
বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহে নানা সংকট দেখা দিয়েছে। এলএনজি সংকট, টার্মিনালে ত্রুটি, কয়লা ও তেলের সংকট এবং আদানি পাওয়ার থেকে কম বিদ্যুৎ সরবরাহ—সব মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে চাপ তৈরি হয়েছে।
আইইইএফএয়ের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। তাঁর মতে, বিদ্যুতের চাহিদা এ বছর ইতোমধ্যে ১৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি এবং গরমের সময়ও আগের তুলনায় দীর্ঘ হচ্ছে। সেপ্টেম্বরেও তীব্র গরম থাকায় বিষয়টি পরিকল্পনায় বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
তিনি সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সংকটের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। উৎপাদন ব্যয় কমানো, সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণ এবং আগামী বছরের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে আগেভাগেই পরিকল্পনা করা জরুরি।
পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি. ডি. রহমতউল্লাহ সরকারের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, ন্যূনতম রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত চালু করা সম্ভব, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
পাশাপাশি আগামী দিনের সংকট এড়াতে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং দেশের নিজস্ব গ্যাস উত্তোলনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
গুরুত্বপূর্ণ দিক
গত ১০ আগস্ট সর্বোচ্চ ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছিল বলে পিডিবির তথ্য।
এবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতেও দিনে-রাতে নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে।
এলএনজি, কয়লা ও তেল সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহের বিভিন্ন সমস্যাও সংকট বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা উৎপাদন ব্যয় ও সিস্টেম লস কমানো, নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া শুধু অস্বস্তির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ছোট ব্যবসার পণ্য সংরক্ষণ, বাসাবাড়ির খাবার ও প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি সচল রাখা। বিশেষ করে জেনারেটর বা বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে না পারা পরিবারগুলোর ওপর চাপ বেশি পড়ছে।
বিশেষ পর্যবেক্ষণ: এবারের সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—লোডশেডিং শুধু বিদ্যুতের উৎপাদন ঘাটতির গল্প নয়, বরং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ ও ভবিষ্যৎ চাহিদার পূর্বপ্রস্তুতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। গরমের সময় বাড়ছে, চাহিদাও বাড়ছে; তাই শুধু আজকের ঘাটতি মেটানোর বদলে আগামী মৌসুমের চাহিদা কত হতে পারে, সেই হিসাব ধরে জ্বালানি ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রস্তুতি নেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর