প্রকাশের তারিখ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জামানত ছাড়াই ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক, যারা আবেদন করতে পারবেন
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
ব্যবসা করার ইচ্ছা আছে, কিন্তু পুঁজি নেই—বাংলাদেশের এমন তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘উদ্যোগ: উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’র আওতায় নির্বাচিত উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন পেতে পারেন। এই অর্থায়নের জন্য কোনো সহায়ক জামানত প্রয়োজন হবে না।বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ বিষয়ে নীতিমালা জারি করেছে। কর্মসূচিটির লক্ষ্য হলো উপজেলা পর্যায় থেকে সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজে বের করা, তাদের ব্যবসায়িক উদ্যোগে সহায়তা দেওয়া এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত নীতিমালা। নীতিমালা অনুযায়ী, আবেদনকারীর বয়স আবেদনের শেষ তারিখে সর্বোচ্চ ২৮ বছর হতে হবে। একই সঙ্গে তাকে বাংলাদেশের নাগরিক এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।তবে সবাই এই সুবিধার আওতায় আসবেন না। ঋণখেলাপি ব্যক্তি, আগে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসায়িক ঋণ নেওয়া ব্যক্তি এবং সরকারি, আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরা এই কর্মসূচিতে আবেদন করতে পারবেন না।এ ক্ষেত্রে আগে থেকেই ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক নয়। তবে আবেদনকারীর ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত হতে হবে এবং সেই উদ্যোগে বাজার সম্ভাবনা ও অর্থনৈতিক কার্যকারিতা থাকতে হবে।‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির আওতায় কেবল নির্দিষ্ট কোনো ব্যবসা নয়, বরং প্রচলিত আইন অনুযায়ী সব ধরনের বৈধ উদ্যোগ বিবেচনা করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে—কৃষি ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসাখাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণমৎস্য ও পশুপালনহস্তশিল্পপর্যটন ও সেবা খাতহালকা প্রকৌশলপ্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপসৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিঅন্যান্য বৈধ নতুন বা বিদ্যমান ব্যবসাবাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মসূচিতে নির্বাচিত উদ্যোক্তার প্রকৃত প্রয়োজন ও সম্ভাব্য ব্যয় মূল্যায়ন করে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন দেওয়া হবে।এই অর্থায়ন দুই ভাগে বিভক্ত—সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণসর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ম্যাচিং গ্র্যান্ট বা অনুদানঅর্থাৎ কোনো উদ্যোক্তার ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণে ১২ লাখ টাকা প্রয়োজন হলে তিনি ৬ লাখ টাকা ঋণ এবং ৬ লাখ টাকা অনুদান পেতে পারেন। তবে অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ হবে ব্যবসার প্রকৃত প্রয়োজন, পরিকল্পনা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ভিত্তিতে।প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঋণের অংশে গ্রাহক পর্যায়ে সুদ বা মুনাফার হার ৪ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে হতে পারে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অনুদানের অংশও সুদমুক্ত ঋণে রূপান্তরিত হবে। এরপর প্রচলিত ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আবেদন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করার সুযোগ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখা থেকে নির্ধারিত ফরম সংগ্রহ ও জমা দেওয়া যাবে।ব্যাংকগুলো আবেদনকারীর ব্যবসায়িক ধারণা, অর্থের প্রয়োজন, বাজার সম্ভাবনা এবং কর্মসংস্থান তৈরির সক্ষমতা যাচাই করবে। এরপর উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের লিড ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদনগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হবে।যোগ্য উদ্যোক্তা বাছাইয়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, তফসিলি ব্যাংক, সফল উদ্যোক্তা, শিল্প খাতের প্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে বিশেষ প্যানেল কাজ করবে। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্থা ১৭ কার্যদিবসের মধ্যে করার কথা বলা হয়েছে।এই কর্মসূচির বিশেষ দিক হলো—শুধু অর্থায়ন দিয়ে দায়িত্ব শেষ করবে না অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো। উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সহায়তাও দেওয়ার কথা রয়েছে।এর মধ্যে থাকবে—আর্থিক সাক্ষরতা প্রশিক্ষণব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তাঅভিজ্ঞ উদ্যোক্তার মাধ্যমে মেন্টরিংট্রেড লাইসেন্স ও ব্যবসা নিবন্ধনে সহায়তাবাজার সংযোগ তৈরির সুযোগব্যবসা পরিচালনা ও অর্থ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পরামর্শবাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণার আগে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচিটি প্রাথমিকভাবে আট জেলার ৬৪টি উপজেলায় চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে মোট ৬৪০ জন উদ্যোক্তা নির্বাচনের কথা জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে কর্মসূচিটি দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করে বছরে প্রায় ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তাকে সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। বাংলাদেশে অনেক তরুণের ব্যবসার ধারণা থাকলেও জামানতের অভাবে ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে উপজেলা পর্যায়ের তরুণদের জন্য সেই বাধা কিছুটা কমতে পারে। বিশেষ করে কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, অনলাইন ব্যবসা, প্রযুক্তি ও স্থানীয় পণ্যভিত্তিক উদ্যোগে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।তবে আবেদনকারীদের মনে রাখতে হবে, ২০ লাখ টাকা মানেই পুরো অর্থ অনুদান নয়। অর্থের একটি অংশ ঋণ হিসেবে পরিশোধ করতে হবে। ঋণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে বা সময়মতো কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে অনুদানের অংশও ঋণে পরিণত হতে পারে।গুরুত্বপূর্ণ দিকসর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে।অর্থায়নের অর্ধেক ঋণ ও অর্ধেক অনুদান হতে পারে।আবেদনকারীর বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর হতে হবে।ঋণখেলাপি ও নির্দিষ্ট শ্রেণির চাকরিজীবীরা আবেদন করতে পারবেন না।ব্যবসার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও বাজার সম্ভাবনা থাকতে হবে।আবেদন করার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের চূড়ান্ত সার্কুলার ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি।তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে স্বচ্ছ বাছাই, রাজনৈতিক বা প্রভাবমুক্ত অর্থায়ন, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং ঋণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহারের ওপর।ব্যবসার স্বপ্ন থাকা তরুণদের জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় সুযোগ। কিন্তু আবেদন করার আগে যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ঋণের শর্ত এবং অনুদান পাওয়ার নিয়ম ভালোভাবে বুঝে নেওয়া উচিত।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর