প্রকাশের তারিখ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গাজায় খাদ্য সংকট তীব্র, ইসরাইলের বিরুদ্ধে ‘ক্ষুধাকে অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
গাজায় যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু ধ্বংসস্তূপে নয়, মানুষের প্রতিদিনের খাবারের থালাতেও স্পষ্ট। ফিলিস্তিনি সরকারের তথ্য দফতর অভিযোগ করেছে, প্রয়োজনীয় খাদ্যের বড় একটি অংশ গাজায় ঢুকতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।তাদের দাবি, গাজার ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ খাদ্য কেনার সামর্থ্য হারিয়েছে এবং মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় খাদ্যের প্রায় ৬৫ শতাংশ প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগও করেছে তারা।তবে এসব সংখ্যা ও অভিযোগ ফিলিস্তিনি তথ্য দফতরের বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অন্যদিকে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ সরবরাহ প্রবেশে নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে থাকে। সাম্প্রতিক রয়টার্স প্রতিবেদনে গাজায় জ্বালানি ও ইঞ্জিন অয়েলের তীব্র সংকট এবং হাসপাতালগুলোর ওপর তার প্রভাবের কথাও উঠে এসেছে।গাজায় খাদ্য সংকটকে আলাদা কোনো সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। খাবারের পাশাপাশি পানি, জ্বালানি, চিকিৎসা ও বিদ্যুতের ঘাটতি মানুষের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি ও ইঞ্জিন অয়েলের ঘাটতির কারণে হাসপাতালগুলোকে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু রাখতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব রোগীর চিকিৎসায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ।ফলে খাদ্য সরবরাহ কমে গেলে শুধু ক্ষুধার সমস্যা তৈরি হয় না; একটি পরিবারের আয়, চিকিৎসা, শিশুদের পুষ্টি এবং নিরাপদ পানির সুযোগ—সবকিছু একসঙ্গে চাপে পড়ে।এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে বেসামরিক জনগণকে যুদ্ধের পদ্ধতি হিসেবে অনাহারে রাখা নিষিদ্ধ। ১৯৭৭ সালের জেনেভা কনভেনশনের অতিরিক্ত প্রোটোকল-১-এর ৫৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বেসামরিক জনগণের অনাহারকে যুদ্ধের পদ্ধতি হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। খাদ্য, কৃষিজমি, ফসল ও পানির মতো বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ধ্বংস বা অকার্যকর করাও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ।আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (ICRC) আরও বলছে, বেসামরিক জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা দ্রুত ও নির্বিঘ্নে পৌঁছানোর সুযোগ দিতে সংঘাতের পক্ষগুলোর দায়িত্ব রয়েছে।তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন ঘটেছে কি না, সেটি নির্ধারণ করতে প্রমাণ, উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। তাই রাজনৈতিক অভিযোগকে সরাসরি চূড়ান্ত আইনি রায় হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।ফিলিস্তিনি তথ্য দফতরের বক্তব্যে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট তৈরি করে গাজার মানুষের জীবনকে কঠিন করে তোলা হচ্ছে। তাদের দাবি, এর একটি উদ্দেশ্য হতে পারে মানুষকে নিজেদের বাড়ি ও জমি ছেড়ে যেতে বাধ্য করা।এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যপ্রাপ্তি এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা—তিনটি বিষয় একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কারণ কোনো পরিবার যদি খাবার, পানি বা চিকিৎসার নিরাপদ সুযোগ না পায়, তখন তারা বাধ্য হয়ে অন্যত্র যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।অন্যদিকে ইসরাইলের পক্ষ থেকে গাজায় সরবরাহ প্রবেশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা যাচাই ও হামাসের কাছে সামরিকভাবে ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী পৌঁছানো ঠেকানোর যুক্তি দেওয়া হয়। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নির্ভরযোগ্য রিপোর্টেও এই অবস্থানের উল্লেখ রয়েছে।গুরুত্বপূর্ণ দিকফিলিস্তিনি তথ্য দফতর গাজায় প্রয়োজনীয় খাদ্য প্রবেশে বাধার অভিযোগ করেছে।তাদের দাবি, ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ খাদ্য কেনার সামর্থ্য হারিয়েছে।খাদ্যের পাশাপাশি জ্বালানি ও চিকিৎসা ব্যবস্থাতেও সংকটের খবর রয়েছে।আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে বেসামরিক জনগণকে অনাহারে রাখা যুদ্ধের পদ্ধতি হিসেবে নিষিদ্ধ।যুদ্ধের রাজনৈতিক হিসাবের বাইরে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো বেসামরিক মানুষের জীবন ও মৌলিক প্রয়োজন। শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ ও বাস্তুচ্যুত মানুষ যাতে খাবার, পানি ও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়—এটি নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক মানবিক ব্যবস্থার অন্যতম বড় দায়িত্ব।মানবিক সহায়তা নিয়ে বিরোধ থাকলে স্বাধীন পর্যবেক্ষণ, স্বচ্ছ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং নিরপেক্ষ সংস্থার মাধ্যমে সহায়তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে একদিকে সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব, অন্যদিকে সহায়তার অপব্যবহার নিয়ে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগও যাচাই করা যায়।গাজার সংকটকে শুধু ‘খাবার ঢুকছে কি না’—এই একটি প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না। খাবার প্রবেশের পর সেটি কার হাতে যাচ্ছে, বাজারে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কতটা, জ্বালানি ও পানি পাওয়া যাচ্ছে কি না এবং শিশুদের পুষ্টির অবস্থা কী—এসব সূচক একসঙ্গে দেখা দরকার।এই কারণেই গাজার মানবিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে নিয়মিত, স্বাধীন ও যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ যেমন তদন্তের আওতায় থাকা দরকার, তেমনি বেসামরিক মানুষের জরুরি প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থাও দ্রুত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর