প্রকাশের তারিখ : ৩১ আগস্ট ২০২৬
ইরানের লারাক দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
হরমুজ প্রণালী ঘিরে আবারও সরাসরি সামরিক উত্তেজনা বেড়েছে। ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি রকেট উৎক্ষেপণকারী স্থাপনায় হামলার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)।জর্ডানের সেনাবাহিনী বলছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। অন্যদিকে আইআরজিসির দাবি, তাদের হামলায় মার্কিন স্থাপনাগুলোতে ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে। তবে হামলায় মার্কিন পক্ষের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।হরমুজের কাছে লারাক দ্বীপে কেন হামলা?মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র কমান্ডার টিম হকিন্সের ভাষ্য অনুযায়ী, আইআরজিসির সদস্যদের হরমুজ প্রণালীতে রকেটের মাধ্যমে সাগরে মাইন নিক্ষেপের প্রস্তুতি নিতে দেখা গিয়েছিল। এই কারণেই লারাক দ্বীপে দুটি রকেট উৎক্ষেপণকারী স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি।লারাক দ্বীপটি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর বান্দার আব্বাসের কাছে এবং হরমুজ প্রণালীর মুখের কাছাকাছি। ফলে এখানে সামরিক তৎপরতার খবর শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যেও পড়তে পারে।আইআরজিসি জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় কয়েকজন নিহত ও আহত হয়েছেন। ইরানের পক্ষ থেকে এই হামলার ‘জবাব ও শাস্তি’ দেওয়ার অঙ্গীকারও করা হয়েছে।জর্ডানে পাল্টা হামলার দাবিলারাক দ্বীপে হামলার পর ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, আইআরজিসি জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে।আইআরজিসির বিবৃতি অনুযায়ী, কিং হুসেইন ও আল-আজরাক এলাকায় থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। এএফপির প্রতিবেদনে আইআরজিসির দাবি উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, হামলায় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ স্থাপনা এবং যুদ্ধবিমান রাখার জায়গাগুলো লক্ষ্য করা হয়েছে।তবে জর্ডানের সামরিক বাহিনী বলছে, সোমবার ভোরে দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা পেত্রা নিউজ এজেন্সি জর্ডানের সেনাবাহিনীর এই বক্তব্য প্রকাশ করেছে।এখানে দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। ইরান বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির দাবি করছে, আর জর্ডান বলছে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করা হয়েছে। তাই মাঠপর্যায়ে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন।হরমুজ প্রণালীই কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?এই সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ এটি। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের ব্যবহৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো বলে দেওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে।বর্তমানে ইরান তেলবাহী জাহাজগুলোকে লারাক দ্বীপের পাশ দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য করছে এবং জাহাজ পরীক্ষা করা হচ্ছে—এমন খবরও এসেছে। পাশাপাশি প্রণালী পার হওয়ার জন্য জাহাজগুলোর কাছ থেকে প্রায় ২০ লাখ ডলার নেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়েছে।এই তথ্য সত্য হলে বিষয়টি শুধু সামরিক সংঘাতের নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেরও বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে পরিবহন খরচ, বীমা ব্যয় এবং জ্বালানির বাজারে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।গুরুত্বপূর্ণ দিকলারাক দ্বীপে দুটি রকেট উৎক্ষেপণকারী স্থাপনায় মার্কিন হামলার দাবি করা হয়েছে।আইআরজিসি জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলার দাবি করেছে।জর্ডান বলেছে, আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক তেল ও এলএনজি সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে।মাইন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যহরমুজ প্রণালী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বক্তব্যের লড়াইও চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান নৌপথটি বন্ধ করতে যে মাইন পেতেছিল, সেগুলো সরিয়ে ফেলা অথবা বিস্ফোরিত করা হয়েছে।ট্রাম্প আরও সতর্ক করেছেন, কোনো জাহাজ বা নৌযান নতুন করে মাইন স্থাপনের চেষ্টা করলে সেটি ধ্বংস করা হবে। তবে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি এই বক্তব্যকে ‘প্রচারমূলক প্রতারণা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।অর্থাৎ হরমুজ প্রণালীতে প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ অবস্থায় বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা এবং নৌপথের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করাই আন্তর্জাতিক মহলের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।ছয় মাসের সংঘাত, নতুন করে বাড়ছে চাপদেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর ব্যাপক হামলা শুরু করার পর সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। জবাবে ইরান ইসরাইল, উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়।এরপর হরমুজ প্রণালী দিয়ে সামুদ্রিক চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এখন যুদ্ধ ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলার মধ্যে লারাক দ্বীপে নতুন মার্কিন হামলা এবং জর্ডানে ইরানের পাল্টা আঘাত সংঘাতকে আবারও নতুন মাত্রায় নিয়ে এসেছে।এর পাশাপাশি গত ২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ইরানকে আরও বিচ্ছিন্ন করা এবং তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা দেশগুলোর ওপরও চাপ বাড়ানো। ইরান অবশ্য এসব পদক্ষেপকে আগের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছে এবং প্রত্যাখ্যান করেছে।সাধারণ মানুষের ভাবনা: যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে থাকে নাএই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এর প্রভাব যুদ্ধরত দেশগুলোর সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি আমদানি, পরিবহন ব্যয় ও বাজারদরে চাপ পড়তে পারে।এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে নজরে রাখার মতো—হরমুজ প্রণালীতে একটি সামরিক পদক্ষেপের প্রভাব কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের একটি দেশের বাজারেও পৌঁছাতে পারে। কারণ জ্বালানি পরিবহনের খরচ বাড়লে তার প্রভাব পরিবহন থেকে শুরু করে পণ্য উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচ পর্যন্ত গড়াতে পারে।তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও জরুরি। নৌপথে বেসামরিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সংঘাতের পক্ষগুলোর মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ রাখা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিরপেক্ষভাবে ঘটনার তথ্য যাচাই—এগুলো উত্তেজনা কমানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নলারাক দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং জর্ডানে ইরানের পাল্টা হামলার দাবির পর এখন প্রশ্ন হলো—সংঘাত কি আবার আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে?বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজার ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।তবে এই মুহূর্তে দুই পক্ষের দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই নিহত, আহত, সামরিক ক্ষয়ক্ষতি কিংবা হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীন সূত্রের তথ্যের অপেক্ষা করাই নিরাপদ।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর