প্রকাশের তারিখ : ২৩ আগস্ট ২০২৬
অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ বন্ধে নতুন উদ্যোগ, কী বললেন গৃহায়নমন্ত্রী?
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ ও আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আর কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। তাঁর দাবি, দেশে ভবন নির্মাণসংক্রান্ত বিদ্যমান আইন, বিধি ও নীতিমালা গত ১৭ বছরে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।এখন থেকে আইন ও অনুমোদিত নকশা কঠোরভাবে অনুসরণ নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে রাজউকের ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র ও নকশা অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়া শতভাগ ডিজিটাল করার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেছেন মন্ত্রী।রোববার (২৩ আগস্ট) সচিবালয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে রিহ্যাব ও বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি।অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণে কড়াকড়িমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, অনেক ভবনের অনুমোদিত নকশায় সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) ও সোক ওয়েল রাখার কথা থাকলেও কিছু ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান তা বাস্তবে নির্মাণ করেনি।এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে ভবিষ্যতে অনুমোদিত নকশার বাইরে কোনো ভবন নির্মাণ করতে না দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।রিহ্যাব ও বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, আইন ভঙ্গ করে যেন কোনো ভবন বা আবাসন প্রকল্প গড়ে না ওঠে, সে বিষয়ে তাদের সচেতন হতে হবে।এর ফলে আবাসন খাতে ডেভেলপারদের পাশাপাশি অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও জবাবদিহিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। শুধু নকশা অনুমোদনের সময় নিয়ম মানা নয়, নির্মাণ শেষ হওয়া পর্যন্ত অনুমোদিত নকশা বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না—সেটিও নিয়মিত যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।রাজউকের অনুমোদন প্রক্রিয়া হবে ডিজিটালভবন নির্মাণে অনুমোদন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও সহজ করতে রাজউকের ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র এবং নকশা অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়া শতভাগ ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে আবেদন, নথি যাচাই, অনুমোদনের অগ্রগতি ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া অনলাইনে পরিচালনার সুযোগ বাড়বে। এতে আবেদনকারীদের সরাসরি দপ্তরে গিয়ে সময় ব্যয় করার প্রয়োজন কমতে পারে।তবে ডিজিটাল ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে শুধু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। সময়সীমা মেনে আবেদন নিষ্পত্তি, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।রাজধানীর বাইরের ডেভেলপারদেরও নীতিমালার আওতায় আনা হবেজাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বিধিমালা সংশোধন করে রাজধানীর বাইরের ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনার কথাও জানিয়েছেন গৃহায়নমন্ত্রী।দেশের বিভিন্ন শহর ও দ্রুত বর্ধনশীল এলাকায় অপরিকল্পিত আবাসন সম্প্রসারণের ঝুঁকি রয়েছে। তাই শুধু রাজধানীকে কেন্দ্র করে নয়, জেলা ও অন্যান্য নগর এলাকাতেও পরিকল্পিত আবাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।এ ক্ষেত্রে ভূমির ব্যবহার, সড়কব্যবস্থা, পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং পরিবেশগত বিষয়গুলোকে আবাসন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।ফ্ল্যাটের টাকা দিয়েও বছরের পর বছর অপেক্ষামতবিনিময় সভায় গ্রাহকদের ভোগান্তির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, অনেক মানুষ বছরের পর বছর আগে টাকা পরিশোধ করেও তাদের কাঙ্ক্ষিত ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট বুঝে পাচ্ছেন না।আবার কোনো কারণে চুক্তি অনুযায়ী কিস্তি চালিয়ে যেতে না পারা গ্রাহকদের অনেকেই তিন-চার বছর ধরে তাঁদের জমা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।এ ধরনের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে ডেভেলপারদের প্রতি আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।আবাসন খাতে গ্রাহক ও ডেভেলপারের সম্পর্ক মূলত চুক্তিভিত্তিক। তাই টাকা ফেরত, প্রকল্পের সময়সীমা, ফ্ল্যাট হস্তান্তর এবং চুক্তির শর্ত—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা থাকলে ভবিষ্যতে বিরোধ কমানো সম্ভব হতে পারে।ড্যাপ ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা নিয়েও আলোচনাসভায় রিহ্যাব ও বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপার অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা আইন ও বিধি মেনে ভবন নির্মাণ এবং আবাসন উন্নয়নের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।এ সময় ঢাকা মহানগর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) এবং ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা নিয়েও তাঁদের মতামত তুলে ধরা হয়।নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে ড্যাপ ও নির্মাণ বিধিমালা গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাস্তবে এসব বিধিমালা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ, ডেভেলপার এবং ভবন মালিক—তিন পক্ষের দায়িত্ব পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন।গুরুত্বপূর্ণ দিক
অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ বন্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে সরকার।
অনুমোদিত নকশায় থাকা এসটিপি ও সোক ওয়েল বাস্তবে নির্মাণ না করার অভিযোগ উঠেছে।
রাজউকের ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র ও নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া শতভাগ ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রাজধানীর বাইরের ডেভেলপারদের নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফ্ল্যাটের টাকা দেওয়ার পরও হস্তান্তর না পাওয়া এবং জমা টাকা ফেরতে বিলম্বের মতো গ্রাহক ভোগান্তির বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
সাধারণ মানুষের ভাবনা: নিয়ম মানার দায়িত্ব সবারভবন নির্মাণের নিয়ম শুধু ডেভেলপার বা নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়; ভবন মালিক, প্রকৌশলী, স্থপতি এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ—সবার দায়িত্বের সঙ্গে এটি যুক্ত।অনুমোদিত নকশায় এক ধরনের ভবন দেখিয়ে বাস্তবে অন্য ধরনের নির্মাণ হলে সেটি শুধু আইন ভঙ্গের বিষয় নয়; ভবনের নিরাপত্তা, পানি নিষ্কাশন, অগ্নিনিরাপত্তা এবং আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।অন্যদিকে গ্রাহকদেরও ফ্ল্যাট বা প্লট কেনার আগে ডেভেলপারের অনুমোদন, প্রকল্পের নকশা, জমির কাগজপত্র, চুক্তির শর্ত এবং হস্তান্তরের সময়সীমা যাচাই করা জরুরি।আমাদের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ: শুধু অনুমোদন নয়, নির্মাণ শেষ হওয়া পর্যন্ত নজরদারি জরুরিভবন নির্মাণে অনিয়ম ঠেকানোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত অনুমোদনের পর্যায়ে নয়, অনুমোদিত নকশা বাস্তবে কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে—সেখানে।একটি প্রকল্পের নকশা নিয়ম মেনে অনুমোদিত হওয়ার পর নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে যদি পরিবর্তন করা হয়, তাহলে শুধু ডিজিটাল অনুমোদন ব্যবস্থা দিয়ে অনিয়ম পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হতে পারে।তাই ডিজিটাল অনুমোদনের পাশাপাশি নির্মাণকাজের পর্যায়ভিত্তিক পরিদর্শন, অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণ মিলিয়ে দেখা এবং অনিয়ম হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন। এতে ডেভেলপারদের জন্য যেমন নিয়ম মানার বাধ্যবাধকতা বাড়বে, তেমনি গ্রাহকরাও তুলনামূলক নিরাপদ আবাসন পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
সভায় রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম, অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল মতিনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এবং রিহ্যাব ও বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপার অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর