প্রকাশের তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬
সৌদির স্কুলের বইয়ে আমূল পরিবর্তন, ইহুদি-খ্রিস্টানদের নিয়ে বদলে গেল পুরোনো বয়ান
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
সৌদি আরবের শিক্ষাব্যবস্থায় গত কয়েক বছরে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, তা আরও বিস্তৃত হচ্ছে। নতুন পাঠ্যবইয়ে উগ্রপন্থা, বৈষম্য ও সহিংসতাকে উৎসাহিত করতে পারে—এমন বিষয়বস্তু বাদ দেওয়ার পাশাপাশি ধর্মীয় সহনশীলতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সমালোচনামূলক চিন্তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।আন্তর্জাতিক শিক্ষা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইমপ্যাক্ট-এসই (IMPACT-se)-এর সর্বশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি সৌদি আরবের ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ব্যবহৃত ১৩৬টি পাঠ্যবই পর্যালোচনা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে ধর্মীয় শিক্ষা ও অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়কে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে। পুরোনো বইয়ে থাকা কিছু নেতিবাচক ও বৈষম্যমূলক বয়ান বাদ দিয়ে নতুন বইয়ে ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও মতাদর্শের মানুষের প্রতি সম্মান এবং সংলাপের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।ইসলাম শিক্ষা বইয়েও সহনশীলতার নতুন বার্তানতুন পাঠ্যক্রমে ইসলাম শিক্ষা বইয়ের বিষয়বস্তুতেও পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে IMPACT-se।প্রতিবেদন অনুযায়ী, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে তৎকালীন ইহুদি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত নতুনভাবে তুলে ধরা হয়েছে।এ ছাড়া যুদ্ধের সময় বেসামরিক মানুষের ক্ষতি না করার বিষয়ে ইসলামের শিক্ষা ও নির্দেশনাও নতুন বইয়ে গুরুত্ব পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।শিক্ষাব্যবস্থায় এমন পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য শুধু ধর্মীয় জ্ঞান দেওয়া নয়; বরং শিক্ষার্থীদের ভিন্ন বিশ্বাস ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে সহাবস্থান এবং মতবিনিময়ের ধারণার সঙ্গে পরিচিত করানো।ইহুদি ও খ্রিস্টানদের উপস্থাপনায় পরিবর্তনIMPACT-se-এর পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, আগের সৌদি পাঠ্যবইয়ে ইহুদি, খ্রিস্টান ও পারসিকদের যেসব ক্ষেত্রে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হতো, নতুন সংস্করণে সেসব বিষয় বাদ দেওয়া হয়েছে।অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের সামনে অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একটি একমাত্রিক বা নেতিবাচক পরিচয় তুলে ধরার প্রবণতা কমানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।এ ধরনের পরিবর্তন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ স্কুলের পাঠ্যবই শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতির উপকরণ নয়। একটি প্রজন্ম অন্য ধর্ম, জাতি বা সংস্কৃতি সম্পর্কে কীভাবে ধারণা তৈরি করবে, তার ওপর পাঠ্যবইয়ের ভাষা ও উদাহরণের বড় প্রভাব থাকে।তবে এসব পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মূল্যায়ন করতে শুধু বইয়ের বিষয়বস্তু পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। শিক্ষকরা কীভাবে এসব বিষয় পড়াচ্ছেন এবং শিক্ষার্থীরা কীভাবে তা গ্রহণ করছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।ইসরায়েল নিয়ে ভাষাতেও পরিবর্তনমধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরার ক্ষেত্রেও সৌদি পাঠ্যবইয়ে ভাষাগত পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে IMPACT-se।প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের বইগুলোতে ইসরায়েলকে ‘ইহুদিবাদী শত্রু’ হিসেবে উল্লেখ করার জায়গায় নতুন বইয়ে ‘ইসরায়েলি দখলদার’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হচ্ছে।তবে রাজনৈতিক অবস্থানের পুরোপুরি পরিবর্তন হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ IMPACT-se-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন পাঠ্যবইয়ের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে এখনো ইসরায়েলের নাম দেখানো হয়নি।অর্থাৎ ভাষায় পরিবর্তন এলেও ইসরায়েলকে ঘিরে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের সব দিক বদলে গেছে—এমন দাবি করার মতো তথ্য এখানে নেই।নারীর ক্ষমতায়নের ছবিও বাড়ছেধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিষয়বস্তুর পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ছাপও নতুন বইগুলোতে দেখা যাচ্ছে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন সংস্করণের পাঠ্যবইয়ে নারী শিক্ষার প্রসার, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সমাজে নারীদের ইতিবাচক ভূমিকা তুলে ধরতে আগের তুলনায় বেশি ছবি ও উদাহরণ যুক্ত করা হয়েছে।এটি সৌদি আরবের বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গেও সম্পর্কিত। দেশটিতে গত কয়েক বছরে নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জনজীবনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।পাঠ্যবইয়ে নারীদের শুধু পারিবারিক ভূমিকায় না দেখিয়ে শিক্ষা, কর্মজীবন ও সামাজিক অবদানের জায়গায় তুলে ধরা হলে শিক্ষার্থীদের সামনে ভবিষ্যৎ ভূমিকার একটি বিস্তৃত ধারণা তৈরি হতে পারে।কেন এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ?সৌদি আরবের শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন শুধু একটি দেশের শিক্ষা সংস্কারের বিষয় নয়। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন এবং সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে।এই প্রেক্ষাপটে স্কুলের পাঠ্যবই পরিবর্তনকে বৃহত্তর সামাজিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা যায়।বিশেষ করে উগ্রপন্থা বা ধর্মীয় বিদ্বেষ কমানোর ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিশু-কিশোররা ছোট বয়স থেকেই ভিন্ন মত ও ধর্মের মানুষের সম্পর্কে কী ধারণা পাচ্ছে, সেটি তাদের ভবিষ্যৎ সামাজিক আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।তবে পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন আনা একাই যথেষ্ট নয়। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য এবং পরিবারের মূল্যবোধ—সব মিলিয়েই একজন শিক্ষার্থীর দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে।গুরুত্বপূর্ণ দিক
২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের ১৩৬টি পাঠ্যবই পর্যালোচনা করেছে IMPACT-se বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উগ্রপন্থা, বৈষম্য ও সহিংসতাকে উৎসাহিত করতে পারে এমন বিষয়বস্তু বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ইহুদি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে উপস্থাপনের ভাষায় পরিবর্তন এসেছে।
ইসলাম শিক্ষা বইয়ে ধর্মীয় সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের উদাহরণ বাড়ানো হয়েছে।
নতুন বইয়ে নারী শিক্ষা ও নারীর ইতিবাচক ভূমিকার ওপর আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সাধারণ মানুষের ভাবনা: বই বদলালেই কি দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাবে?পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমাজে সহনশীলতা তৈরি করতে বইয়ের পাশাপাশি বাস্তব শিক্ষাব্যবস্থাতেও তার প্রতিফলন থাকা দরকার।শিক্ষার্থীরা যদি বইয়ে অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের প্রতি সম্মানের কথা পড়ে, কিন্তু বাস্তব শ্রেণিকক্ষ বা সামাজিক পরিবেশে তার বিপরীত বার্তা পায়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন পুরোপুরি নাও আসতে পারে।তাই পাঠ্যবই সংশোধনের পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মুক্ত আলোচনার সুযোগ এবং তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিলে এই উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে।আমাদের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ: পরিবর্তনটি শুধু শব্দ বদলের নয়সৌদি পাঠ্যবইয়ের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো—এটি শুধু কয়েকটি শব্দ বাদ দেওয়া বা নতুন শব্দ বসানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।ধর্মীয় শিক্ষায় অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের উদাহরণ, যুদ্ধের সময় বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, নারীর ইতিবাচক ভূমিকা এবং ভিন্ন মতের প্রতি সম্মান—এই বিষয়গুলো একই সঙ্গে সামনে আনা হয়েছে।এর অর্থ, পাঠ্যক্রমে শিক্ষার্থীর পরিচয় ও বিশ্বের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি—দুই ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে। তবে এই পরিবর্তন কতটা গভীরে পৌঁছেছে, সেটি বোঝার জন্য আগামী কয়েক বছরে শিক্ষার্থীদের আচরণ, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাদান পদ্ধতির ওপর স্বাধীন গবেষণা প্রয়োজন হবে।
সৌদি আরবের শিক্ষাক্রমের এই পরিবর্তন তাই শুধু একটি পাঠ্যবই সংশোধনের ঘটনা নয়; বরং দেশটির শিক্ষা ও সামাজিক নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে নজরে রাখার মতো বিষয়।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর