প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬
পাবনায় সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে টাকা আদায়ের অভিযোগ, বিএনপি নেতা গণপিটুনির পর পুলিশের হাতে
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
প্রতারণার অভিযোগে বিএনপি নেতাকে পিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ, অর্ধশতাধিক মানুষের টাকা নেওয়ার দাবিসরকারি সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অর্ধশতাধিক মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগে পাবনার ভাঙ্গুড়ায় এক বিএনপি নেতাকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন স্থানীয়রা। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও কেউ প্রতিশ্রুত সুবিধা না পাওয়ায় ক্ষোভ চরমে পৌঁছে। পরে প্রতারণার অভিযোগ তুলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করা হয়।শুক্রবার (৫ জুন) রাতে ভাঙ্গুড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত সোহেল রানা ভাঙ্গুড়া উপজেলার পারভাঙ্গুড়া ইউনিয়নের রাঙ্গালিয়া গ্রামের বাসিন্দা এবং স্থানীয় বিএনপির ৩ নম্বর ওয়ার্ড শাখার সহসভাপতি হিসেবে পরিচিত।ভুক্তভোগীরা ইতোমধ্যে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।কী অভিযোগ ভুক্তভোগীদের?স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক মাস ধরে সোহেল রানা বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে আসছিলেন। ভিজিডি কার্ড, সরকারি ঘর, পানির পাম্পসহ নানা সুবিধা দেওয়ার আশ্বাসে ভাঙ্গুড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।এই পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। পরে কয়েকজন ভুক্তভোগী নিজেদের অভিজ্ঞতা একে অপরের সঙ্গে ভাগাভাগি করলে অভিযোগের পরিধি আরও বড় আকারে সামনে আসে।‘এক বছরেও কার্ড পাইনি’ভুক্তভোগী সোহেল আহমেদ জানান, সরকারি চালের কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি কোনো কার্ড পাননি।অন্যদিকে স্থানীয় একটি হোটেলের কর্মী তায়জাল হোসেন অভিযোগ করেন, সরকারি ঘর দেওয়ার আশ্বাসে তাঁর কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল। টাকা দেওয়ার প্রমাণও তাঁর কাছে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনো ঘর বরাদ্দ পাননি।ভুক্তভোগীদের দাবি, এ ধরনের অভিযোগ শুধু দু-একজনের নয়। অর্ধশতাধিক মানুষ একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। অনেকেই সাত থেকে আট মাস কিংবা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু কোনো ফল না পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন।ক্ষোভ থেকে গণধোলাই, পরে থানায় হস্তান্তরস্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে কয়েকজন ভুক্তভোগী ভাঙ্গুড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সোহেল রানাকে দেখতে পেয়ে তাঁকে আটক করেন। এ সময় উত্তেজিত জনতা তাঁকে মারধর করে বলে অভিযোগ রয়েছে।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পর তাঁকে ভাঙ্গুড়া থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ জমা দেন।তবে অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত সোহেল রানার সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি।অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী গণমাধ্যমকে বলেন, তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ নতুন নয়। তিনি দাবি করেন, মানুষ টাকা দিয়েছেন এবং এখন টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। যদিও অভিযোগের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি।পুলিশ ও বিএনপির অবস্থান কী?ভাঙ্গুড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকিউল আযম জানিয়েছেন, সরকারি সুবিধা দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগে কয়েকজন ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।তিনি বলেন, অভিযোগে যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে সেগুলো যাচাই করা হবে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।এদিকে ভাঙ্গুড়া উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাফর ইকবাল হিরোক বলেন, সোহেল রানার বিরুদ্ধে এর আগেও অনুরূপ অভিযোগ শোনা গেছে। দলের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে তাঁকে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে।তিনি আরও জানান, অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে দলীয়ভাবেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।কেন বারবার এমন প্রতারণার অভিযোগ?সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি থাকায় অনেক সময় প্রতারক চক্র সুযোগ নেয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ দ্রুত সরকারি সহায়তা পাওয়ার আশায় মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন।বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিকে অর্থ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না—এ তথ্য অনেকের জানা থাকলেও বাস্তবে নানা প্রতিশ্রুতি ও প্রভাব খাটানোর আশ্বাসে মানুষ প্রলুব্ধ হয়ে পড়েন। ফলে প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ে।এ ধরনের ঘটনা শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং মানুষের মধ্যে সরকারি সেবার প্রতি অনাস্থাও তৈরি করে। তাই সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত তদন্তের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে ভাঙ্গুড়ার আলোচিত এই ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা এবং অর্থ লেনদেনের প্রকৃত চিত্র তদন্ত শেষে আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর