প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ মে ২০২৬
দিনাজপুরে দেশের অন্যতম বৃহৎ ঈদুল আজহার জামাত, লাখো মুসল্লির তাকবিরে মুখর গোর-এ-শহীদ ঈদগাহ
ফিরোজ সরকার ||
উত্তরবঙ্গজুড়ে ঈদের মিলনমেলা, লাখো মানুষের উপস্থিতিতে জনসমুদ্রে পরিণত ঐতিহাসিক ঈদগাহত্যাগ, আত্মশুদ্ধি আর মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আহ্বানে দিনাজপুরে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহা। আর সেই আনন্দকে আরও বিশেষ করে তুলেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ঈদের জামাত। ঐতিহাসিক গোর-এ-শহীদ কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টায় অনুষ্ঠিত প্রধান জামাতে অংশ নেন লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লি। ঈদের নামাজকে ঘিরে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক বিশাল মানবসমুদ্রে।ভোরের আলো ফুটতেই দিনাজপুর শহরের বিভিন্ন সড়ক দিয়ে দলে দলে মুসল্লিদের ঈদগাহমুখী হতে দেখা যায়। শুধু দিনাজপুর নয়, আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ ছুটে আসেন এই বৃহৎ জামাতে অংশ নিতে। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো মাঠ ও আশপাশের এলাকা তাকবিরের ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।২২ একরের ঈদগাহে লাখো মানুষের ঢলপ্রায় ২২ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত গোর-এ-শহীদ ঈদগাহ দীর্ঘদিন ধরেই উত্তরবঙ্গের অন্যতম বড় ঈদ জামাতের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর এখানে বিপুল সংখ্যক মুসল্লির সমাগম হলেও এবার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো বেশি।ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ রাতের শেষ ভাগ থেকেই মাঠে আসতে শুরু করেন। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুবান্ধব কিংবা আত্মীয়দের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে আসেন এই ঐতিহাসিক ঈদগাহে।চারদিকে শুধু সাদা টুপি, পাঞ্জাবি আর একসঙ্গে উচ্চারিত তাকবির—“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার…”ধর্মীয় আবেগ, ভ্রাতৃত্ববোধ আর সৌহার্দ্যের এক অনন্য পরিবেশ তৈরি হয় পুরো এলাকায়।বিশিষ্ট আলেমের ইমামতিতে প্রধান জামাতঈদের প্রধান জামাতে ইমামতি করেন দিনাজপুর জেলা ইমাম সমিতির সভাপতি ও বিশিষ্ট আলেম আলহাজ্ব মাওলানা মতিউর রহমান কাসেমী।খুতবায় তিনি মুসলিম উম্মাহকে ত্যাগের শিক্ষা বাস্তব জীবনে ধারণ করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি সমাজে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।নামাজ শেষে দেশ, জাতি এবং মুসলিম বিশ্বের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। ফিলিস্তিন, কাশ্মীরসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের শিকার মুসলমানদের জন্যও দোয়া করা হয়।মোনাজাতের সময় অনেক মুসল্লিকে আবেগাপ্লুত হয়ে কান্না করতে দেখা যায়।নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থাএত বড় জামাতকে কেন্দ্র করে দিনাজপুর জেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয় বিশেষ প্রস্তুতি।মুসল্লিদের নিরাপদে নামাজ আদায়ের জন্য মাঠজুড়ে অর্ধশতাধিক মাইক স্থাপন করা হয়। প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য রাখা হয় ১০টি আলাদা গেট। এছাড়া দুইটি ওয়াচ টাওয়ার থেকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ চালানো হয়।মাঠে মেডিকেল টিম, অ্যাম্বুলেন্স, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, অস্থায়ী ওযুখানা ও টয়লেট স্থাপন করা হয়। নারী মুসল্লিদের জন্য ছিল পৃথক নামাজের ব্যবস্থা।যানবাহন পার্কিং এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় স্বেচ্ছাসেবক টিমকে সক্রিয় দেখা যায় পুরো সময়জুড়ে।দিনাজপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। মাঠজুড়ে পুলিশ, র্যাব, আনসার ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের অবস্থান ছিল চোখে পড়ার মতো। পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়।ঈদের জামাতে মিলল সব শ্রেণির মানুষঈদের এই বৃহৎ জামাতে অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। শিশু, কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে ঈদগাহ মাঠ যেন পরিণত হয় এক বিশাল মিলনমেলায়।দিনাজপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা, পৌর প্রশাসক মো. রিয়াজ উদ্দিনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারাও জামাতে অংশ নেন।ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম—সব বিভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ আদায় করতে দেখা যায় মানুষকে।অনেক মুসল্লি জানান, এত বড় জামাতে একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারা তাদের কাছে আলাদা এক অনুভূতি।আহলে হাদিস অনুসারীদের পৃথক জামাতঅন্যদিকে দিনাজপুর আদর্শ কলেজ মাঠে সকাল সাড়ে ৭টায় আহলে হাদিস অনুসারীদের প্রধান ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও বিপুল সংখ্যক মুসল্লির উপস্থিতি দেখা যায়।শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জামাত সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন আয়োজকরা।শহরজুড়ে অর্ধশতাধিক ঈদ জামাতগোর-এ-শহীদ কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ছাড়াও দিনাজপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় আরও অর্ধশতাধিক ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়।চাউলিয়াপট্টি-দক্ষিণ লালবাগ ঈদগাহ মাঠ, পশ্চিম পাটুয়াপাড়া জামে মসজিদ সংলগ্ন মাঠ, বালুয়াডাঙ্গা ঈদগাহ, লালবাগ ফুটবল মাঠ, ইকবাল স্কুল মাঠ, তফিউদ্দিন মেমোরিয়াল স্কুল মাঠ এবং সুইহারি ঈদগাহে বিপুল সংখ্যক মুসল্লি অংশ নেন।সদর উপজেলার চেরাডাঙ্গী ঈদগাহ মাঠেও বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা গেছে।ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক বার্তাবিশ্লেষকদের মতে, এত বড় পরিসরে শান্তিপূর্ণভাবে ঈদের জামাত আয়োজন শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধেরও বড় উদাহরণ।বর্তমান সময়ে নানা বিভাজনের মধ্যেও মানুষ যখন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে শান্তি, মানবতা ও সহমর্মিতার বার্তা দেয়, তখন তা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।স্থানীয়রা মনে করছেন, দিনাজপুরের এই ঐতিহাসিক ঈদ জামাত শুধু উত্তরবঙ্গ নয়, পুরো দেশের জন্যই একটি অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।সব মিলিয়ে শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল এবং ধর্মীয় আবহে দিনাজপুরে পবিত্র ঈদুল আজহার প্রধান জামাত সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মুসল্লি, স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর