প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬
ঢামেক শিশু ওয়ার্ডে বেড সংকট চরমে, এক বেডে চিকিৎসা নিচ্ছে পাঁচ শিশু
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
একজনের বেডে পাঁচজন শিশু, ঢামেকের শিশু ওয়ার্ডে অসহনীয় ভোগান্তিঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে এখন যেন নিঃশ্বাস নেওয়ারও জায়গা নেই। যে বেডে একজন শিশুর চিকিৎসা হওয়ার কথা, সেখানে কখনও তিনজন, কখনও পাঁচজন পর্যন্ত শিশু গাদাগাদি করে শুয়ে আছে। কোথাও বিদ্যুৎ নেই, কোথাও পানি সংকট, আবার কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও মিলছে না জরুরি সেবা। অসুস্থ শিশুদের কান্না আর উদ্বিগ্ন স্বজনদের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতালের পরিবেশ।রাজধানীর সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ২০৭, ২০৮ ও ২১০ নম্বর শিশু ওয়ার্ড ঘুরে এমনই চিত্র দেখা গেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে আসছেন অভিভাবকরা। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের লড়তে হচ্ছে সিট সংকট, অতিরিক্ত ভিড় ও নানা অব্যবস্থাপনার সঙ্গে।১৪টি বেডে ৮২ শিশুশনিবার সরেজমিনে দেখা যায়, ২১০ নম্বর ওয়ার্ডে মাত্র ১৪টি বেড থাকলেও ভর্তি রয়েছে ৮২ জন শিশু রোগী। ২০৮ নম্বর ওয়ার্ডে ২০টি বেডের বিপরীতে রোগী ৬৪ জন। আর ২০৭ নম্বর ওয়ার্ডে ১৮টি বেডে চিকিৎসা নিচ্ছে ৪৮ শিশু।এত বিপুল রোগীর চাপে ওয়ার্ডজুড়ে তৈরি হয়েছে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। কোথাও বেডের পাশে মেঝেতে চাদর পেতে বসে আছেন স্বজনরা, আবার কোথাও একই বেডে একাধিক শিশুকে নিয়ে রাত কাটাতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।মুন্সীগঞ্জ থেকে সন্তান জুনায়েদকে নিয়ে আসা মাসুম পারভেজ বলেন, প্রায় এক বছর ধরে তার সন্তানের চিকিৎসা চলছে। গত আট দিন ধরে শিশু ওয়ার্ডে আছেন তারা।তার অভিযোগ, “ওয়ার্ডে এত গরম আর ভিড় যে বাচ্চারা ঠিকমতো ঘুমাতেও পারে না। রাতে নার্স ডাকলে অনেক সময় বিরক্তি দেখানো হয়। নিচের কিছু কর্মচারীর আচরণও ভালো না।”তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, চিকিৎসকরা নিয়মিত দেখছেন এবং চেষ্টা করছেন।“এখানে থাকতে থাকতে আমিই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি”নরসিংদী থেকে আসা হাসিনা বেগম তার ৯ মাস বয়সী ছেলে আবির হাসানকে নিয়ে ভর্তি আছেন। তিনি বলেন, “চিকিৎসা ভালো, কিন্তু এত রোগীর মধ্যে থাকা খুব কঠিন। আগে ছেলের অবস্থা খারাপ ছিল, এখন একটু ভালো।”আরেক স্বজন লাভলী বেগমের অভিযোগ আরও গুরুতর। তার সন্তানের কিডনি ও মস্তিষ্কজনিত জটিলতা রয়েছে। দুই মাস ধরে হাসপাতালে আছেন তিনি।তার ভাষ্য, “বারবার বলার পরও বিকাল পর্যন্ত ক্যানুলা লাগানো হয়নি। ক্যানুলা না হওয়ায় ওষুধও দেওয়া যায়নি। শুধু পরে আসতে বলেছে।”২০৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি শিশু মুরসালিনের নানি উম্মে কুলসুম বলেন, “এখানে থাকতে থাকতে আমিই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। হাসপাতালের খাবারে গন্ধ পাই। তাই বাইরে থেকে কিনে খেতে হয়। তবে ডাক্তাররা ভালোভাবে দেখছেন।”বিদ্যুৎ নেই, পানি সংকট, ভাঙা ওয়াশরুমশুধু রোগীর চাপ নয়, হাসপাতালের পরিবেশ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে স্বজনদের মধ্যে।শিশু তানহার বাবা মোহাম্মদ তাওহীদ বলেন, “এক ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ ছিল না। সকাল থেকে ভোল্টেজ ওঠানামা করছে। এক বেডে দুজন-তিনজন রোগী থাকায় গরমে টিকে থাকা মুশকিল। পুরো রুমটা যেন বন্ধ ঘরের মতো লাগে।”রোগীর স্বজন আল আমিন হোসেন অভিযোগ করেন, পানি ও বিদ্যুতের সংকট প্রায়ই দেখা দেয়। এছাড়া বেশ কয়েকটি ওয়াশরুমের ছিটকিনি নষ্ট থাকায় নারী স্বজনদের নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে হয়।ক্যানসারে আক্রান্ত তিন বছর বয়সী শিশু রায়ানকে নিয়ে ২৫ দিন ধরে হাসপাতালে থাকা হোসনেয়ারা আক্তার বলেন, ক্যানসার ওয়ার্ডে সিট না পাওয়ায় শিশু ওয়ার্ডেই থাকতে হচ্ছে।তিনি সরকারের কাছে শিশু ক্যানসার চিকিৎসার জন্য আলাদা ও উন্নত সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানান।“শুধু নার্সদের দোষ দিলে হবে না”হাসপাতালের কর্মীদের একাংশও বলছেন, পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তাদের পক্ষেও কঠিন হয়ে পড়ছে।নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নার্স জানান, রোগীর তুলনায় নার্সের সংখ্যা অনেক কম। তার ভাষায়, “নাইট ডিউটিতে বসারও সময় থাকে না। ৭০-৮০ জন রোগীর ইনজেকশন, ক্যানুলা, ওষুধ সব সামলাতে হয়। পাশাপাশি কাগজপত্রও মেইনটেইন করতে হয়।”তিনি আরও বলেন, একজন রোগীর সঙ্গে অনেক সময় কয়েকজন স্বজন থাকায় ওয়ার্ডের ভেতর অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হয়। এতে চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হয় বলেও দাবি করেন তিনি।২০৭ নম্বর ওয়ার্ডের রোগীর স্বজন গোলাম মোস্তফা বলেন, “রোগীর চাপ অনেক বেশি। তাই সেবা পেতে দেরি হয়। শুধু নার্সদের দোষ দিয়ে লাভ নেই।”কেন বাড়ছে এমন সংকট?জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত বেড না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য ও ইনফরমেটিক্স বিভাগের সভাপতি ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বর্তমানে দেশে হামের প্রকোপ বেড়েছে। ফলে অনেক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। কিন্তু পর্যাপ্ত বেড না থাকায় একসঙ্গে অনেক রোগীকে একই জায়গায় রাখতে হচ্ছে।তার মতে, এতে হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে। সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগীদের একই ওয়ার্ডে রাখাও বিপজ্জনক হতে পারে।তিনি শিশুদের জন্য আলাদা ও পর্যাপ্ত বেড, সংক্রমিত রোগীদের পৃথক ওয়ার্ড এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর পরামর্শ দেন।নতুন ভবনের পরিকল্পনাঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, মূল সমস্যা রোগীর অতিরিক্ত চাপ। তার দাবি, সব সরকারি হাসপাতালকে রোগী ভাগাভাগি করে নিতে হবে।তিনি জানান, হাসপাতালে বর্তমানে প্রায় তিন হাজার চিকিৎসক ও আড়াই হাজার নার্স রয়েছেন। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী আরও বেশি নার্স ও কর্মচারী প্রয়োজন।স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ঢামেকের পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ৩২ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী অর্থবছরে এ বিষয়ে কার্যক্রম এগোনোর কথা রয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে, নতুন ভবনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এমন মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে চিকিৎসা নিতে থাকা শিশু ও তাদের পরিবারগুলো কীভাবে দিন পার করবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর