প্রিন্ট এর তারিখ : ২৩ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬
প্রধানমন্ত্রীর এপিএস পরিচয়ে বদলি-নিয়োগ বাণিজ্য, মানিকগঞ্জে গ্রেপ্তার প্রতারক মামুন
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
প্রধানমন্ত্রীর এপিএস পরিচয়ে বদলি-নিয়োগ বাণিজ্য, অবশেষে ধরা পড়লেন প্রতারক মামুননিজেকে কখনও প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস), কখনও সাংবাদিক, আবার কখনও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী পরিচয় দিতেন। ফোন করতেন সরকারি দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের। আশ্বাস দিতেন বদলি, পদোন্নতি, চাকরি— এমনকি মামলার নাম বাদ দেওয়ারও। অভিযোগ উঠেছে, এই পরিচয়ের আড়ালে বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন বিপুল অর্থ। অবশেষে মানিকগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন সেই আব্দুল্লাহ আল মামুন।শুক্রবার (২২ মে) বিকেলে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম জানান, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সাভারের জালেশ্বর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪৬ বছর বয়সী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার উয়াইল গ্রামের বাসিন্দা।পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মামুন দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা করে আসছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে আগেও একাধিক মামলা রয়েছে এবং অন্তত দুটি মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত বলে জানিয়েছে পুলিশ।এক ফোনেই বদলি, চাকরি আর ‘প্রভাবশালী’ পরিচয়তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মামুন এমনভাবে কথা বলতেন যেন তিনি সত্যিই ক্ষমতাধর কোনো ব্যক্তি। সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে কথা বলে তিনি বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করতেন। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে বদলি ও পদোন্নতির আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করতেন তিনি।পুলিশ সুপার জানান, সাম্প্রতিক সময়ে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এবং খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে ফোন করে নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর এপিএস পরিচয় দেন। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রকৃত এপিএস-১ রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।সেই জিডির সূত্র ধরেই তদন্তে নামে গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর প্রযুক্তিগত নজরদারি ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করা হয়।গ্রেপ্তারের সময় যা উদ্ধার হলোডিবি পুলিশের অভিযানে মামুনের কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে, যেটি প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হতো বলে দাবি করা হচ্ছে। এছাড়া উদ্ধার করা হয়েছে ভুয়া সাংবাদিক পরিচয়পত্র, ‘সাংবাদিক’ লেখা একটি জিপ গাড়ি, ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী’ সম্বলিত লিফলেট এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের ফটোকপি।পুলিশ বলছে, এসব উপকরণ ব্যবহার করে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে নিজেকে প্রভাবশালী ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরতেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বিভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণার কথা স্বীকার করেছেন বলেও দাবি করেছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।তবে তাঁর কাছ থেকে কত টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বা কতজন প্রতারণার শিকার হয়েছেন, সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি পুলিশ। তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।জমি-ফ্ল্যাট ব্যবসার আড়ালে অন্য খেলা?পুলিশের দাবি, মামুন মূলত জমি ও ফ্ল্যাট ব্যবসার আড়ালে প্রতারণার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচয়ের কথা বলে তিনি মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করতেন।তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমাজে এমন এক শ্রেণির মানুষ তৈরি হয়েছে যারা ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থাকার গল্প শুনিয়ে সাধারণ মানুষের দুর্বলতাকে কাজে লাগায়। চাকরি বা বদলির মতো সংবেদনশীল বিষয়ে মানুষ যখন দ্রুত সমাধান চায়, তখনই প্রতারক চক্রগুলো সুযোগ নেয়।বিশেষ করে সরকারি চাকরি, পদোন্নতি বা প্রশাসনিক বদলির মতো বিষয়গুলোতে অনেকেই শর্টকাট খোঁজেন। আর সেই সুযোগেই সক্রিয় হয়ে ওঠে এমন প্রতারকরা। অভিযোগ উঠেছে, মামুনও সেই মানসিক দুর্বলতাকে পুঁজি করেই দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা চালিয়ে গেছেন।জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী মামলাকেও বানানো হয়েছিল ‘বাণিজ্য’প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মামুন নাকি আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বিভিন্ন মামলার আসামিদের নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েও তিনি অর্থ আদায়ের চেষ্টা করতেন।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বড় ঘটনার পর মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সেই ভয় বা আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে প্রতারকরা নানা ধরনের ‘সংযোগ’ বা ‘বিশেষ ক্ষমতা’র গল্প ছড়ায়। এতে সাধারণ মানুষ অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল পরিচয়ের যুগে ভুয়া প্রভাবশালী পরিচয় তৈরি করা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে। একটি ভিজিটিং কার্ড, গাড়িতে স্টিকার, কিংবা কিছু প্রভাবশালী মানুষের সঙ্গে ছবি— এগুলো ব্যবহার করেই অনেকে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে ফেলছে।আগেও ছিল মামলা, তবু কীভাবে সক্রিয় ছিলেন?পুলিশ জানিয়েছে, আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে চেক জালিয়াতিসহ অন্তত ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্তও হয়েছেন। এরপরও কীভাবে তিনি দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতারণার টাকার লেনদেন, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।প্রেস ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মাসুম এবং জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ইনচার্জ মানবেন্দ্র বালো উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনাটি আবারও সামনে আনলো একটি পুরোনো বাস্তবতা— ক্ষমতার নাম ব্যবহার করে প্রতারণা এখন নতুন কিছু নয়। তবে প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর মানুষের দ্রুত সুবিধা পাওয়ার প্রবণতা এসব চক্রকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নয়, সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি বলে মত অনেকের।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর