প্রিন্ট এর তারিখ : ২৩ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তন আনছে ইসি: থাকছে না পোস্টার, দলীয় প্রতীক ও ইভিএম
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
স্থানীয় নির্বাচনে বড় পরিবর্তন: পোস্টার-প্রতীক ছাড়াই ভোটের প্রস্তুতি, অক্টোবরে মাঠে নামতে চায় ইসিবাংলাদেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থায় একসঙ্গে এত বড় পরিবর্তনের ঘোষণা আগে খুব কমই দেখা গেছে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে থাকছে না কাগজের পোস্টার, ব্যবহার করা যাবে না দলীয় প্রতীক, এমনকি ভোট হবে না ইভিএমেও। পুরো নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে নির্দলীয় কাঠামোয়। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নির্বাচনী সহিংসতা কমানো, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ রক্ষা এবং ভোটকে আরও গ্রহণযোগ্য করতেই এই বড় সংস্কারের পথে হাঁটা হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী অক্টোবর থেকেই ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে।সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিধিমালায় বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।পোস্টারবিহীন নির্বাচনের সিদ্ধান্ত কেন?স্থানীয় নির্বাচন এলেই শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গা পোস্টারে ঢেকে যাওয়ার দৃশ্য এখন প্রায় পরিচিত বাস্তবতা। কিন্তু এবার সেই চিত্র বদলে যেতে পারে পুরোপুরি। ইসি বলছে, পরিবেশ দূষণ কমানো এবং নির্বাচনী খরচ নিয়ন্ত্রণে আনতেই পোস্টার নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পোস্টারভিত্তিক প্রচারণা দীর্ঘদিন ধরেই প্রার্থীদের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। এতে অনেক যোগ্য কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল প্রার্থী পিছিয়ে পড়েন। পোস্টার নিষিদ্ধ হলে প্রচারণার ধরন বদলাবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সরাসরি গণসংযোগের ওপর গুরুত্ব বাড়তে পারে।তবে সমালোচকরাও প্রশ্ন তুলছেন—গ্রামীণ এলাকাগুলোতে ডিজিটাল প্রচারণা কতটা কার্যকর হবে? বিশেষ করে যেখানে ইন্টারনেট ব্যবহার এখনও সীমিত, সেখানে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।দলীয় প্রতীক বাদ, পুরো নির্বাচন নির্দলীয়ইসির সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বাতিল করা। নির্বাচন কমিশন বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে রাজনৈতিক সংঘাতমুক্ত রাখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।এর ফলে কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী দলীয় প্রতীক ব্যবহার করতে পারবেন না। সবাইকে স্বতন্ত্র পরিচয়ে ভোটে অংশ নিতে হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে দলীয় প্রতীকের কারণে অনেক সময় ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার চেয়ে রাজনৈতিক বিভাজন বেশি প্রভাব ফেলত। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে স্থানীয় নেতৃত্ব ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।তবে বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্নও আছে। কারণ, অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, দলীয় প্রতীক না থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফলে মাঠপর্যায়ে এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে, সেটি এখন বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।ইভিএম বাদ, ফিরছে পুরোপুরি ব্যালট ভোটভোটগ্রহণে ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবার পুরো ভোটই হবে ব্যালট পেপারে।গত কয়েক বছরে ইভিএম নিয়ে নানা বিতর্ক, অভিযোগ এবং আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় অংশ বারবার ইভিএমের বিরোধিতা করেছে। অভিযোগ উঠেছিল, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং স্বচ্ছতা নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও বিভ্রান্তি রয়েছে।এই প্রেক্ষাপটে ব্যালটে ফেরার সিদ্ধান্তকে অনেকে ভোটারদের আস্থা ফেরানোর চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, ব্যালট ভোটে কারচুপি বা কেন্দ্র দখলের পুরোনো আশঙ্কাও আবার সামনে আসতে পারে, যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা না যায়।স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য স্বস্তির খবরস্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহের বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই নিয়ম নিয়ে বিতর্ক ছিল। অনেকের অভিযোগ ছিল, এটি ছোট ও নতুন প্রার্থীদের জন্য অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি করে।এছাড়া উপজেলা পরিষদ ছাড়া অন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে ইসি। যদিও নতুন জামানতের অঙ্ক এখনো প্রকাশ করা হয়নি।একই সঙ্গে অনলাইনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার সুযোগও বাতিল করা হচ্ছে। ফলে প্রার্থীদের সরাসরি মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে।প্রবাসী ভোট ও ফেরারি আসামিদের বিষয়ে কড়াকড়িনতুন বিধিমালায় প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ভোটের সুযোগ থাকছে না বলে জানিয়েছে ইসি। এছাড়া ফেরারি আসামিরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলায় চার্জশিটভুক্ত ব্যক্তিদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। যদিও রাজনৈতিক মহলের একটি অংশের দাবি, এই বিধান ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিতর্কের কারণ হতে পারে। কারণ, কোন মামলাকে কীভাবে ব্যবহার করা হবে—সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।সহিংসতা ঠেকাতে ইসির ‘কঠোর বার্তা’স্থানীয় সরকার নির্বাচন মানেই অনেক সময় সংঘর্ষ, কেন্দ্র দখল কিংবা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ। এই বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশন এবার শুরু থেকেই কঠোর অবস্থানের কথা জানাচ্ছে।জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু করতে চারটি বিষয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—সরকারের নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, ইসির কঠোর অবস্থান এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সততা।তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো কেন্দ্রে অনিয়ম বা ভোট জালিয়াতির প্রমাণ মিললে তাৎক্ষণিকভাবে সেই কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা প্রিসাইডিং ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের থাকবে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আইন করলেই সহিংসতা বন্ধ হয় না। মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আচরণও বড় ভূমিকা রাখে। অতীতে দেখা গেছে, স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ব্যক্তিগত ও আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব অনেক সময় বড় সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।বদলাবে কি স্থানীয় নির্বাচনের সংস্কৃতি?নির্বাচন কমিশনের এই নতুন উদ্যোগকে কেউ দেখছেন ইতিবাচক সংস্কার হিসেবে, আবার কেউ এটিকে বড় পরীক্ষাও বলছেন। পোস্টারবিহীন ও নির্দলীয় নির্বাচন বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার ওপর।বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থের ব্যবহার এবং পেশিশক্তির সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে শুধু নিয়ম বদলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন যদি ঘোষিত অবস্থানে কঠোর থাকতে পারে, তাহলে স্থানীয় নির্বাচন ব্যবস্থায় নতুন এক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী জুনের মধ্যেই সংশোধিত বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত হবে। এরপর ঈদুল আজহার পর কমিশনের অনুমোদন শেষে অক্টোবর থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাঠ গরম হতে পারে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর