প্রিন্ট এর তারিখ : ২৩ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬
খাগড়াছড়ির পানছড়িতে ইউপিডিএফ-জেএসএস গোলাগুলি, সেনা অভিযানে অস্ত্র ও শতাধিক গুলি উদ্ধার
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
খাগড়াছড়িতে পাহাড়ি দুগ্রুপের গোলাগুলি, সেনা অভিযানে উদ্ধার চায়না রাইফেল ও বিপুল গুলিখাগড়াছড়ির পানছড়িতে পাহাড়ি দুই আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে তীব্র গোলাগুলির ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষের পর সেনাবাহিনী বিশেষ অভিযান চালিয়ে একটি চায়না রাইফেল, শতাধিক তাজা গুলি ও বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে। পুরো ঘটনায় এলাকাজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে সেনাবাহিনী।বৃহস্পতিবার (২১ মে) পানছড়ি উপজেলার লোগাং ইউনিয়নের বাবুরাপাড়া ও করল্যাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের দাবি, দুপুরের পর থেকেই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে দফায় দফায় গুলির শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে আশপাশের মানুষ।আধিপত্যের দ্বন্দ্ব থেকেই সংঘর্ষ?সেনাবাহিনী সূত্রে জানা গেছে, এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে।খবর পেয়ে খাগড়াছড়ি জোনের একটি বিশেষ সেনা টহল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান শুরু করে। তবে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে সশস্ত্র সদস্যরা টহল দলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে বলে দাবি করা হয়েছে। পরে আত্মরক্ষার্থে সেনাসদস্যরাও পাল্টা গুলি চালালে হামলাকারীরা সেখান থেকে সরে যায়।এই ঘটনায় কোনো সেনাসদস্য হতাহত হয়নি বলে নিশ্চিত করেছে সেনাবাহিনী।স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের মধ্যে আধিপত্য নিয়ে টানাপোড়েন চলছে। মাঝেমধ্যেই চাঁদাবাজি, অপহরণ ও অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগ ওঠে। তবে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার কারণে।অভিযানে যা উদ্ধার হলোঅভিযান শেষে ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে একটি আধুনিক চায়না রাইফেল, ২৭৪ রাউন্ড তাজা গুলি, দুটি এফসিসি এবং সশস্ত্র সদস্যদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ দেখে ধারণা করা হচ্ছে, সংঘর্ষে অংশ নেওয়া গ্রুপগুলো আগে থেকেই বড় ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে অবস্থান করছিল। যদিও এই অস্ত্র কারা ব্যবহার করছিল, সেটি তদন্তাধীন রয়েছে।খাগড়াছড়ি জোনের জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. খাদেমুল ইসলাম বলেন, “খাগড়াছড়ি জোনের আওতাধীন এলাকায় কোনো ধরনের চাঁদাবাজ ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের জায়গা হবে না। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে।”তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমনে ভবিষ্যতেও জিরো টলারেন্স নীতিতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।পাহাড়ে কেন থামছে না সহিংসতা?পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বহু বছর ধরেই আঞ্চলিক আধিপত্য, রাজনৈতিক মতবিরোধ এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘাতের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকাগুলোতে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সশস্ত্র উত্তেজনা তৈরি হয়।নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পাহাড়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অবিশ্বাস এবং আঞ্চলিক বিভক্তি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ফলে ছোট ছোট বিরোধও কখনো কখনো বড় সহিংসতায় রূপ নেয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি বাসিন্দারা।স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, রাত নামলেই আতঙ্কে থাকতে হয়। কোথাও গুলির শব্দ, কোথাও চাঁদার চাপ—সব মিলিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের স্কুলে যাওয়া এবং বাজারে স্বাভাবিক ব্যবসা পরিচালনায়ও প্রভাব পড়ছে।আতঙ্কের ছাপ সাধারণ মানুষের জীবনেওঘটনার পর লোগাং ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। অনেকেই সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছেন। কয়েকজন অভিভাবক জানিয়েছেন, শিশুদের স্কুলে পাঠানো নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ বলছেন, পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ফেরাতে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সংলাপ, আস্থা তৈরি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কারণ সংঘাত যত দীর্ঘ হয়, ততই সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে নতুন করে যেন কোনো সংঘর্ষ না ঘটে, সে জন্য নিরাপত্তা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।এদিকে গোলাগুলির ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, এত অস্ত্র কীভাবে দুর্গম এলাকায় পৌঁছাচ্ছে এবং কেন বারবার একই ধরনের সহিংসতার খবর সামনে আসছে।
সব মিলিয়ে খাগড়াছড়ির পানছড়ির এই ঘটনা আবারও পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে সামনে নিয়ে এসেছে। যদিও প্রশাসন বলছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে, তবুও স্থানীয়দের মনে আতঙ্ক এখনো কাটেনি পুরোপুরি।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর