প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬
রাঙ্গুনিয়ায় ওমানে নিহত ৪ ভাইকে পাশাপাশি দাফন, জানাজা পড়ালেন একমাত্র জীবিত ভাই
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
রাঙ্গুনিয়ায় পাশাপাশি শায়িত ওমানে মৃত ৪ ভাই, একমাত্র জীবিত ভাই পড়ালেন জানাজাচট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় বুধবার সকালটা যেন এক বিশাল শোকমিছিল হয়ে উঠেছিল। ওমানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো চার সহোদরের মরদেহ যখন গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। আর সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মুহূর্তটি তৈরি হয় তখন, যখন চার ভাইয়ের জানাজা পড়াতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁদের একমাত্র জীবিত ভাই মো. এনাম।স্থানীয়দের ভাষ্য, এমন শোকাবহ দৃশ্য বহু বছরেও দেখেননি তারা। একই পরিবারের চার ছেলেকে একসঙ্গে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে পুরো রাঙ্গুনিয়া উপজেলা। বুধবার বেলা ১১টায় উপজেলার লালানগর উচ্চবিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত জানাজায় কয়েক হাজার মানুষের ঢল নামে। মাঠজুড়ে মানুষের ভিড়ে দাঁড়ানোর জায়গাও ছিল না।“ভাইদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না এনাম”নিহত চার ভাই হলেন রাঙ্গুনিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা প্রয়াত মোহাম্মদ হাসানের ছেলে রাশেদুল ইসলাম, সাহেদুল ইসলাম, মো. সিরাজ ও মো. শহিদ। পরিবারের পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে এখন বেঁচে আছেন শুধু মো. এনাম।জানাজায় উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি জানান, নামাজ শুরু করার আগেই কান্নায় ভেঙে পড়েন এনাম। ভাইদের মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি কয়েকবার নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। তাঁর কান্না ছড়িয়ে পড়ে উপস্থিত মানুষের মধ্যেও। অনেকে চোখের পানি লুকাতে পারেননি।স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “একসঙ্গে চার ভাইয়ের লাশ—এটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। এনামের অবস্থা দেখে পুরো মাঠ কেঁদেছে।”হাজারো মানুষের ঢল, থমকে যায় পুরো এলাকাপ্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, জানাজায় প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ অংশ নেন। শুধু রাঙ্গুনিয়া নয়, আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকেও মানুষ ছুটে আসেন শেষবারের মতো চার ভাইকে দেখতে।উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, প্রবাসী পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সেখানে জড়ো হন। অনেকেই বলেন, এটি শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, পুরো এলাকার শোক।জানাজার পর মরদেহগুলো নিয়ে যাওয়া হয় বন্দররাজাপাড়া জামে মসজিদসংলগ্ন কবরস্থানে। সেখানে পাশাপাশি খনন করা চারটি কবরে তাঁদের দাফন করা হয়। চার ভাইকে পাশাপাশি শায়িত করার সময় আবারও কান্নার রোল পড়ে যায় পুরো এলাকায়।দেশে ফেরার প্রস্তুতির মাঝেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাপরিবার সূত্রে জানা গেছে, নিহত চার ভাই দীর্ঘদিন ধরে ওমানে প্রবাসজীবন কাটাচ্ছিলেন। পরিবারকে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল করতে বছরের পর বছর বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করেছেন তারা। সম্প্রতি দেশে ফেরার পরিকল্পনাও করেছিলেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।ছোট ভাই মো. এনাম জানান, দুর্ঘটনার আগেও ভাইদের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত কথা হতো। দেশে ফিরে পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে সময় দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। কিন্তু হঠাৎ সড়ক দুর্ঘটনা সবকিছু বদলে দেয়।তিনি আরও জানান, নিহত চার ভাইয়ের মধ্যে দুজন অবিবাহিত ছিলেন। পরিবারের অনেক স্বপ্ন ও পরিকল্পনাও তাঁদের মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে গেল বলে আক্ষেপ করেন স্বজনরা।বিমানবন্দর থেকে গ্রামের বাড়ি—কান্নার পথযাত্রামঙ্গলবার রাতে চার ভাইয়ের মরদেহ দেশে আনা হয় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখানে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ গ্রহণ করেন। পরে রাতভর অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।বুধবার ভোরে গ্রামের বাড়িতে মরদেহ পৌঁছালে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। বাড়ির সামনে শত শত মানুষ জড়ো হন। অনেকেই কফিন ছুঁয়ে শেষ বিদায় জানান। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।স্থানীয় কয়েকজন জানান, চার ভাই খুবই পরিশ্রমী ও শান্ত স্বভাবের ছিলেন। গ্রামের মানুষের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কও ছিল আন্তরিক। প্রবাসে থেকেও নিয়মিত পরিবারের খোঁজ নিতেন এবং এলাকার বিভিন্ন সামাজিক কাজেও সহায়তা করতেন।প্রবাস জীবনের অদৃশ্য ঝুঁকি আবারও আলোচনায়এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে প্রবাসীদের জীবনের কঠিন বাস্তবতা। দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখা লাখো প্রবাসী প্রতিদিন নানা ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে কাজ করেন। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সড়ক নিরাপত্তাহীনতা, মানসিক চাপ ও অনিরাপদ যাতায়াত অনেক সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে দুর্ঘটনায় নিহত প্রবাসীদের পরিবারগুলো যেন দ্রুত সহায়তা পায়, সে বিষয়েও নজর দেওয়া দরকার।মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে একসঙ্গে হারানো স্বজনদের জন্য ভয়াবহ মানসিক আঘাত তৈরি করে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের পাশে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও প্রশাসনের মানবিক উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।শোকে স্তব্ধ রাঙ্গুনিয়াচার ভাইয়ের একসঙ্গে মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি পুরো এলাকার মানুষের জন্যও গভীর বেদনার ঘটনা হয়ে উঠেছে। জানাজা শেষে অনেকে দীর্ঘসময় কবরস্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ কেউ নীরবে দোয়া পড়ছিলেন, আবার কেউ কাঁদছিলেন নিঃশব্দে।
স্থানীয়দের ভাষায়, “এমন দৃশ্য যেন আর কখনও দেখতে না হয়।”
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর