প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
প্রেমের সম্পর্ক থেকে হত্যাকাণ্ড, পীরগঞ্জে অন্তঃসত্ত্বা নারী হত্যায় যুবকের ফাঁসি
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
রংপুরের পীরগঞ্জে অন্তঃসত্ত্বা এক নারী ও তার গর্ভের সন্তানকে হত্যার ঘটনায় মো. মাসুদ মিয়া (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ২০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। সোমবার রংপুরের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালত দীর্ঘ শুনানি শেষে এ রায় ঘোষণা করেন।আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে ঘটে যাওয়া আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য, আলামত ও তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিচারক ফজলে খোদা মো. নাজির এই রায় দেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।প্রেমের সম্পর্ক থেকে জটিলতামামলার নথি অনুযায়ী, নিহত সান্ত্বনা খাতুন (২৫) ঢাকার আশুলিয়ায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। একই কারখানায় চাকরির সুবাদে তার সঙ্গে মাসুদ মিয়ার পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।তদন্তে উঠে আসে, একপর্যায়ে তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হলে সান্ত্বনা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। এরপর তিনি বিয়ের দাবি জানান। অভিযোগ রয়েছে, মাসুদ শুরুতে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে সান্ত্বনা বিয়ের দাবিতে মাসুদের গ্রামের বাড়ি পীরগঞ্জ উপজেলার টুকুরিয়া ইউনিয়নের মোনাইল গ্রামে যান।স্থানীয় সূত্র বলছে, সান্ত্বনা বিয়ের ব্যাপারে চাপ দিতে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এমনকি তিনি আইনের আশ্রয় নেওয়ার কথাও বলেছিলেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।বিয়ের আশ্বাসে ডেকে নিয়ে হত্যার অভিযোগমামলার বিবরণে বলা হয়, বিয়ের আশ্বাস দিয়ে মাসুদ সান্ত্বনাকে পীরগঞ্জে নিয়ে যান। পরে বড়আলমপুর ইউনিয়নের আকুবেরপাড়া এলাকার একটি আখখেতে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ।ঘটনার পর ওই নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই ঘটনায় তার গর্ভে থাকা সন্তানও মারা যায়। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।প্রথমদিকে নিহতের পরিচয় ও ঘটনার কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও পরে তদন্তে সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসে। এরপর মামলার তদন্ত নতুন দিকে মোড় নেয়।তদন্তে বেরিয়ে আসে সম্পর্কের তথ্য২০২৩ সালের ১৫ জুলাই এ ঘটনায় পীরগঞ্জ থানায় অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। শুরুতে মামলাটি তদন্ত করেন পীরগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক আহসান হাবীব প্রিন্স। পরে তদন্তের দায়িত্ব পান পুলিশ পরিদর্শক মো. মোস্তফা কামাল।তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মোবাইল ফোনের তথ্য, স্থানীয়দের জবানবন্দি এবং বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করে মাসুদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত হন তদন্ত কর্মকর্তারা। দীর্ঘ তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়।রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে দাবি করে, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। অপরদিকে আসামিপক্ষ আদালতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরলেও শেষ পর্যন্ত আদালত রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন।আদালতের পর্যবেক্ষণরায়ের সময় আদালত উল্লেখ করেন, একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীকে হত্যা শুধু একটি ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনা নয়, বরং অনাগত একটি প্রাণকেও শেষ করে দেওয়া। তাই এ ধরনের অপরাধ সমাজে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।আদালত আরও বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা ও প্রতারণামূলক সম্পর্কের পরিণতিতে ঘটে যাওয়া অপরাধগুলো উদ্বেগজনক। এসব ঘটনায় কঠোর অবস্থান সমাজে আইন ও ন্যায়বিচারের বার্তা দেয়।পরিবারে এখনও শোকের ছাপসান্ত্বনার পরিবারের সদস্যরা রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও তাদের ভাষায়, এই রায় তাদের মেয়েকে ফিরিয়ে দেবে না। তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মামলার বিচারপ্রক্রিয়া চলায় পরিবারকে মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছিল। অনেকেই এটিকে বিশ্বাস ও সম্পর্কের অপব্যবহারের একটি নির্মম উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।সামাজিক বাস্তবতার কঠিন প্রতিচ্ছবিএই ঘটনা আবারও সামনে এনেছে সম্পর্ক, প্রতিশ্রুতি ও নারীর নিরাপত্তা নিয়ে সমাজের পুরোনো প্রশ্নগুলো। বিশেষ করে কর্মস্থলে গড়ে ওঠা সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতারণা, সামাজিক চাপ এবং নারীদের অসহায় অবস্থার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধু শাস্তি দিলেই এমন ঘটনা কমবে না। প্রয়োজন সচেতনতা, নারীদের আইনি সহায়তা সহজ করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ানো। একই সঙ্গে সম্পর্কের নামে প্রতারণা বা সহিংসতার অভিযোগগুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের দাবিও উঠছে।এখন পরবর্তী ধাপআইনজীবীরা জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে উচ্চ আদালতে রায়ের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি চাইলে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন।
এদিকে স্থানীয় প্রশাসন বলছে, আদালতের রায়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের আলোচিত মামলাটির একটি আইনি পরিণতি এসেছে। তবে পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও সময় লাগতে পারে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর