প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
কালবৈশাখীর এক রাতেই লন্ডভন্ড গাইবান্ধা, বিদ্যুৎহীন হাজারো পরিবার
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
গাইবান্ধার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ভয়াবহ কালবৈশাখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। গভীর রাতের তাণ্ডবে ভেঙে পড়েছে বাড়িঘর, উপড়ে গেছে গাছপালা, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্কুল-মাদ্রাসা ও ধর্মীয় স্থাপনা। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলার মানুষ। বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে ও তার ছিঁড়ে যাওয়ায় সেখানে অন্তত ৮০ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎহীন অবস্থায় আছেন বলে জানিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।রোববার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে শুরু হওয়া ঝড়ের সঙ্গে ছিল দমকা হাওয়া ও ভারী বৃষ্টি। কয়েক মিনিটের এই তাণ্ডবেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হয় আতঙ্ক। সোমবার সকাল থেকে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে আসতে শুরু করে।ভেঙেছে বিদ্যুতের খুঁটি, অন্ধকারে ডুবে বহু এলাকাসুন্দরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আব্দুল বারী জানিয়েছেন, ঝড়ে হাসপাতাল এলাকা, উপজেলা পরিষদ চত্বরসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১২টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে গেছে। আরও চারটি খুঁটি হেলে পড়েছে। এছাড়া ২০ থেকে ৩০টি জায়গায় বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বহু মিটারও নষ্ট হয়েছে।তিনি বলেন, ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ায় দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রায় ৪৫ জন কর্মী কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে কাজ করছেন। তবে পুরোপুরি বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।স্থানীয়রা জানান, ঝড়ের পর থেকেই সুন্দরগঞ্জের অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও দুর্বল হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির মোটর, ছোট ব্যবসা ও দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে।ঘর হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে অনেক পরিবারঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দহবন্দ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম। উত্তর ও দক্ষিণ ধুমাইটারি, হুড়াভায়া, গোপালচরণ এবং আশপাশের এলাকায় অসংখ্য টিনের ঘর উড়ে গেছে। কোথাও গাছ ভেঙে পড়েছে বসতবাড়ির ওপর, কোথাও আবার পুরো ঘর মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।দহবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল আলম সরকার জানান, তার ইউনিয়নে অন্তত ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি পরিবারের ঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। অনেক পরিবার রাত কাটিয়েছে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বা খোলা জায়গায়।ক্ষতিগ্রস্ত এক বাসিন্দা বলেন, “হঠাৎ করেই প্রচণ্ড শব্দে ঘরের চাল উড়ে যায়। বাচ্চাদের নিয়ে বাইরে বের হতে না হতেই গাছ পড়ে যায় পাশেই। এখন থাকার মতো ঠিকমতো জায়গা নেই।”বাজার, স্কুল ও ফসলেরও বড় ক্ষতিসুন্দরগঞ্জ পৌর এলাকার মীরগঞ্জ বাজারে একটি বিশাল বটগাছ হেলে পড়ে কয়েকটি ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোকানের টিন ও কাঠামো ভেঙে পড়ে অনেক ব্যবসায়ীর মালামাল নষ্ট হয়েছে।এছাড়া সুন্দরগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষ ও কয়েকটি শ্রেণিকক্ষও ক্ষতির মুখে পড়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ছাদের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিক্ষাকার্যক্রম চালু রাখতে সমস্যা হতে পারে।অন্যদিকে ঝড়ের সঙ্গে হওয়া ভারী বৃষ্টিতে নিচু এলাকার ধানখেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কৃষকরা বলছেন, কাটা বাকি থাকা অনেক পাকা ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন বহু কৃষক।ফুলছড়িতেও শতাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্তএকই রাতে ফুলছড়ি উপজেলার এরেন্ডাবাড়ি ইউনিয়নেও ঝড়ের তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দক্ষিণ হরিচন্ডি গ্রামসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত তিন শতাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।কাঁচা ঘরবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা ও গাছপালার ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। কয়েকটি এলাকায় গাছ পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। গাছচাপায় দুটি ছাগল মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।এরেন্ডাবাড়ি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আব্দুর রশিদ বলেন, দক্ষিণ হরিচন্ডি গ্রামের বহু পরিবার এখন বিপদে আছে। অন্তত ১৫ থেকে ২০টি পরিবার মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছে। তাদের অনেকের ঘরের চাল উড়ে গেছে, কেউ কেউ সম্পূর্ণ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন।প্রশাসনের তৎপরতা, তৈরি হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকাসুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান তুলি জানিয়েছেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণে কাজ চলছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা দ্রুত প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানও একই ধরনের তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তালিকা প্রস্তুত শেষে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝড়ের পর অনেক এলাকায় এখনও পর্যাপ্ত ত্রাণ বা জরুরি সহায়তা পৌঁছেনি। বিশেষ করে যাদের ঘরবাড়ি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে, তারা দ্রুত সহযোগিতা চান।বাড়ছে দুর্যোগের ঝুঁকি, উদ্বেগ স্থানীয়দেরউত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কালবৈশাখীর তীব্রতা বাড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। ঘন ঘন ঝড়, অতিবৃষ্টি ও নদীভাঙনের কারণে গ্রামীণ জনপদের মানুষের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোতে টেকসই ঘর নির্মাণ, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রম জরুরি। কারণ প্রতি বছর এমন ঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্নআয়ের মানুষ ও কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো।
এদিকে গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ পুনঃসংযোগের কাজ চলছে। প্রশাসন ও বিদ্যুৎ বিভাগ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কাজ করলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর