প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
গ্রাফিতি ঘিরে উত্তেজনা: টাইগারপাসে মুখোমুখি বিএনপি-এনসিপি, রাতভর থমথমে চট্টগ্রাম
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি বহনকারী গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। রোববার রাতে নগরীর টাইগারপাস এলাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বিএনপির নেতাকর্মীরা পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিলে এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।রাত গভীর পর্যন্ত দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ ঘটনায় নগর রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি, রাজনৈতিক প্রতীক এবং নগর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে।গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগে বিক্ষোভপ্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন এনসিপি মহানগর শাখার নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনের সময় আঁকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রাফিতি ও দেয়াললেখা মুছে ফেলা হয়েছে।বিক্ষোভকারীরা টাইগারপাস এলাকায় অস্থায়ী ব্যারিকেড দেন। এ সময় সড়কের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে স্লোগান ও দেয়াললেখা দেখা যায়। কয়েকটি লেখায় চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকে ইঙ্গিত করে সমালোচনাও করা হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।এক পর্যায়ে এনসিপির নেতাকর্মীরা সেখান থেকে সরে গেলেও উত্তেজনা কমেনি। পরে বিএনপির নেতাকর্মীরা একই এলাকায় মিছিল বের করেন। এতে পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে।ফেসবুক পোস্ট ঘিরে নতুন উত্তেজনারাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগরের সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিন ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে অভিযোগ করেন, গ্রাফিতি নষ্ট করতে পরিকল্পিতভাবে লোক পাঠানো হয়েছে।তিনি তার অনুসারী ও দলীয় নেতাকর্মীদের চসিক কার্যালয়ের সামনে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর রাত ১১টার দিকে দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা আবারও টাইগারপাস এলাকায় অবস্থান নেন।এ সময় পাল্টাপাল্টি স্লোগানে পুরো এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ৩০ থেকে ৪০ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দুই পক্ষকে দূরত্ব বজায় রাখতে অনুরোধ করেন।রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত এলাকায় চাপা উত্তেজনা থাকলেও সংঘর্ষ বা ভাঙচুরের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।মেয়রের বক্তব্য: ‘শহর অশান্ত করার চেষ্টা চলছে’রাত সোয়া ১২টার দিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন লালখান বাজার এলাকায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে তিনি নিজের রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন নির্যাতন ও হামলার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।মেয়র বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় তার বাসভবনে হামলা চালানো হয়েছিল। তার দাবি, ওই সময় তার ১৬টি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয় এবং ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।তিনি বলেন, গ্রাফিতি নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার পরও একটি পক্ষ নগরীতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শহরের সৌন্দর্য রক্ষায় আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের দিয়ে নতুন করে নান্দনিক গ্রাফিতি আঁকার উদ্যোগ নেওয়া হবে।ডা. শাহাদাত আরও বলেন, চসিক প্রয়োজনীয় অর্থ না দিলে ব্যক্তিগত অর্থ দিয়েও তিনি এ কাজ বাস্তবায়ন করবেন।এনসিপির পাল্টা অবস্থানঅন্যদিকে এনসিপি নেতা আরিফ মঈনুদ্দিন মেয়রের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আন্দোলনের স্মৃতি ও প্রতীক মুছে ফেলার কোনো অধিকার কারও নেই। তিনি দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত তরুণদের আবেগ ও আত্মত্যাগকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে।একই সঙ্গে তিনি চসিক মেয়রের মেয়াদ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দ্রুত পদত্যাগের আহ্বান জানান। যদিও এ বিষয়ে মেয়রের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।জুলাইয়ের গ্রাফিতি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শহরে গত বছরের আন্দোলনের সময় দেয়ালচিত্র, স্লোগান ও গ্রাফিতি রাজনৈতিক প্রতিবাদের অন্যতম ভাষা হয়ে উঠেছিল। তরুণদের অনেকেই এসব দেয়াললেখাকে আন্দোলনের স্মৃতি ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখেন।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গ্রাফিতি এখন শুধু শিল্প নয়; এটি জনমতের বহিঃপ্রকাশও। ফলে এগুলো মুছে ফেলা বা পরিবর্তনের চেষ্টা অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আন্দোলনের স্মৃতি ধরে রাখার প্রবণতা বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ বলছেন শহরের সৌন্দর্য রক্ষায় পরিকল্পিত দেয়ালচিত্র প্রয়োজন, আবার কেউ মনে করছেন আন্দোলনের চিহ্ন মুছে ফেলা ইতিহাসকে চাপা দেওয়ার শামিল।প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট নয়ঘটনার সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন, তারা সংঘর্ষ এড়াতে সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।এদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকেও গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা তৈরি হয়েছে।বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সংবেদনশীল ইস্যুতে দ্রুত ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা না এলে ভুল বোঝাবুঝি বাড়তে পারে। এতে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনাও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।নগর রাজনীতিতে নতুন বার্তাচট্টগ্রামের সাম্প্রতিক এই ঘটনা শুধু দেয়াললেখা বা গ্রাফিতিকে ঘিরে নয়, বরং রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রভাব বিস্তারের লড়াইকেও সামনে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।বিশেষ করে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এনসিপির সক্রিয়তা এবং বিএনপির সাংগঠনিক উপস্থিতি—দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চাইছে। এর ফলে সামনের দিনগুলোতে নগর রাজনীতিতে আরও উত্তাপ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।তবে সাধারণ নগরবাসীর প্রত্যাশা, রাজনৈতিক মতভেদ যেন সহিংসতায় না গড়ায়। আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণ কিংবা নগর সৌন্দর্য—দুই বিষয়েই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন অনেকে।
বর্তমানে টাইগারপাস এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ নজরদারি রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সংশ্লিষ্ট মহল সতর্ক অবস্থানে আছে বলে জানা গেছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর