প্রিন্ট এর তারিখ : ১৭ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬
এক মাসের যুদ্ধে ইরানে প্রাণহানি ৩ হাজার ছাড়াল, বাড়ছে মানবিক সংকট
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা হামলায় নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশজুড়ে মানবিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে বলে দাবি করা হচ্ছে।বৃহস্পতিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশটির ফরেনসিক বিভাগের প্রধানের বরাতে বলা হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে বিভিন্ন প্রদেশে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। নিহতদের বড় একটি অংশের পরিচয় শনাক্তের কাজ এখনও চলমান রয়েছে।নিহতদের পরিচয় শনাক্তে চলছে ডিএনএ পরীক্ষাইরানের ফরেনসিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের প্রায় ৪০ শতাংশের পরিচয় এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা গেছে। অনেক মরদেহ বিকৃত অবস্থায় উদ্ধার হওয়ায় শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের আগে ডিএনএ পরীক্ষা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হচ্ছে। কয়েকটি অঞ্চলে অস্থায়ী শনাক্তকরণ কেন্দ্রও খোলা হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।যুদ্ধের কারণে হাসপাতাল ও জরুরি সেবার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। চিকিৎসক সংকট, ওষুধের ঘাটতি এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে আহতদের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।হামলার লক্ষ্যবস্তুতে সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামোইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় শুধু সামরিক ঘাঁটি নয়, গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, সড়ক ও হাসপাতাল হামলার শিকার হয়েছে বলে বলা হচ্ছে।তেহরানসহ কয়েকটি বড় শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। অনেক এলাকায় ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগও অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বহু পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি।যদিও হামলার বিষয়ে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।যুদ্ধবিরতি নিয়েও অনিশ্চয়তাগত ৭ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় হামলা ও সামরিক তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।সম্প্রতি লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি হামলার পর ইরান যুদ্ধবিরতি বাতিলের হুমকি দিয়েছে। দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে “কঠোর প্রতিক্রিয়া” দেওয়া হতে পারে।বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়তে থাকলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে লেবানন, সিরিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা চলছে।অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা, সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্তচলমান সংঘাতে ইরানের প্রায় ১৪৫ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে। শিল্পকারখানা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং পরিবহন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি হয়েছে।দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়েছে। ব্যাংকিং ও বাণিজ্য কার্যক্রমও স্বাভাবিক গতিতে চলছে না বলে জানা গেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগ এবং আমদানি-রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। অনেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও ওষুধ মজুত করতে শুরু করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে ধ্বংসস্তূপ, আহত মানুষ এবং আশ্রয়কেন্দ্রে ভিড়ের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। যদিও এসব তথ্যের কিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছেজাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ইরান ও লেবাননে বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটি আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে।এছাড়া অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তে ইরানের ফরেনসিক বিভাগকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে।কূটনৈতিক মহলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান না এলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।সামাজিক প্রভাব: যুদ্ধের চাপ সাধারণ মানুষের কাঁধেএই সংঘাত শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। পরিবার হারানো মানুষ, বাস্তুচ্যুত শিশু এবং চিকিৎসাহীন আহতদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ একটি দেশের সামাজিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব বহু বছর ধরে থেকে যায়। একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি তরুণদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপও বাড়িয়ে দেয়।এখন কী পরিস্থিতিবর্তমানে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ফরেনসিক বিভাগ নিহতদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহল নতুন করে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার আহ্বান জানালেও মাঠের পরিস্থিতি এখনও অস্থির রয়ে গেছে।
সংঘাত বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—আর যেন নতুন প্রাণহানির খবর না আসে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর