প্রিন্ট এর তারিখ : ১৭ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
আম পাড়তে গিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু: মণিরামপুরে বিদ্যুৎস্পর্শে প্রাণ গেল যুবকের
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
যশোরের মণিরামপুর উপজেলায় আম পাড়তে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে আলমগীর হোসেন (৩৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার দুপুরে উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের খোজালীপুর গ্রামে ঘটে এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যুতের মেইন লাইনের খুব কাছাকাছি অবস্থানে গাছ থাকায় অসাবধানতাবশত বাঁশের আঁকশি তারে লেগে যায় এবং মুহূর্তেই ঘটে যায় বিপর্যয়।পরিবার ও এলাকাবাসীর কাছে ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। দুপুরের স্বাভাবিক সময়েই আম পাড়তে গাছে উঠেছিলেন আলমগীর। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের ভুলেই নিভে যায় একটি তরতাজা প্রাণ।গাছের মাথায় আটকে ছিলেন দীর্ঘ সময়স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, খোজালীপুর গ্রামের একটি নারকেল গাছের মাথায় উঠে পাশের গাছ থেকে আম পাড়ার চেষ্টা করছিলেন আলমগীর হোসেন। এ সময় তাঁর হাতে থাকা কাঁচা বাঁশের আঁকশিটি অসাবধানতাবশত পাশ দিয়ে যাওয়া পল্লী বিদ্যুতের মূল লাইনের তারের সংস্পর্শে চলে যায়।প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিদ্যুৎ পরিবাহী তারে বাঁশটি স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো বাঁশে বিদ্যুৎ ছড়িয়ে পড়ে। এতে গাছের ওপর থাকা অবস্থাতেই মারাত্মকভাবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন আলমগীর। তিনি গাছের মাথায় আটকে যান এবং তাৎক্ষণিকভাবে আর সাড়া দেননি।ঘটনার আকস্মিকতায় আশপাশের মানুষ হতভম্ব হয়ে পড়েন। কেউ দ্রুত এগিয়ে যেতে সাহস পাননি, কারণ তখনও বিদ্যুতের সংযোগ চালু ছিল বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা।ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার অভিযানদুর্ঘটনার খবর পেয়ে মণিরামপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। পরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বিশেষ কৌশলে গাছের ওপর থেকে আলমগীর হোসেনের মরদেহ নিচে নামানো হয়।উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া এক কর্মী জানান, বিদ্যুতের লাইনের খুব কাছাকাছি অবস্থানে গাছ থাকায় উদ্ধার কার্যক্রমে বাড়তি সতর্কতা নিতে হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরই তাঁরা গাছে উঠতে সক্ষম হন।ফায়ার সার্ভিস সূত্রে বলা হয়েছে, গ্রামাঞ্চলে ফল পাড়ার সময় প্রায়ই মানুষ বিদ্যুতের ঝুঁকিকে গুরুত্ব দেন না। বিশেষ করে কাঁচা বাঁশ বা ভেজা লাঠি ব্যবহার করলে তা দ্রুত বিদ্যুৎ পরিবাহক হিসেবে কাজ করতে পারে, যা প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।শোকে স্তব্ধ খোজালীপুর গ্রামআলমগীর হোসেনের মৃত্যুতে খোজালীপুর গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবারের সদস্যদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। প্রতিবেশীরা জানান, আলমগীর ছিলেন শান্ত স্বভাবের এবং পরিশ্রমী একজন মানুষ। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিয়মিত কাজ করতেন তিনি।এক প্রতিবেশী বলেন, “সকালে স্বাভাবিকভাবেই সবাইকে কথা বলে বের হয়েছিল। কে জানত দুপুরেই এমন খবর শুনতে হবে!”স্থানীয়দের অনেকেই অভিযোগ তুলেছেন, গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের তার গাছের খুব কাছ দিয়ে যাওয়ায় প্রায়ই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।বাড়ছে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিবছর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে বর্ষা ও গ্রীষ্ম মৌসুমে গাছে উঠে ফল পাড়া, বৈদ্যুতিক খুঁটির আশপাশে কাজ করা কিংবা অসচেতনভাবে বিদ্যুতের তার স্পর্শ করার কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁচা বাঁশ, ভেজা কাঠ কিংবা ধাতব বস্তু বিদ্যুতের সংস্পর্শে এলে তাৎক্ষণিকভাবে শরীরে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে। গ্রামাঞ্চলে সচেতনতার অভাব এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা না মানার প্রবণতাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।স্থানীয়দের দাবি, পল্লী বিদ্যুতের ঝুঁকিপূর্ণ লাইনের আশপাশে থাকা বড় গাছগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মানুষকে সচেতন করতে প্রচার কার্যক্রম বাড়ানোর কথাও বলেছেন অনেকে।প্রশাসনের বক্তব্যমণিরামপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ লাইনের আশপাশে কোনো ধরনের কাজ করার সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। বিশেষ করে ফল পাড়া বা গাছে ওঠার আগে আশপাশে বৈদ্যুতিক তার রয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া উচিত।স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটি নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ ও পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো অবহেলার অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ের হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।সচেতনতার অভাবই কি বড় কারণ?এই দুর্ঘটনা আবারও গ্রামাঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে নিয়ে এসেছে। অনেক সময় মানুষ দৈনন্দিন কাজকে ঝুঁকিমুক্ত ভেবে সতর্কতা ছাড়াই কাজ করেন। কিন্তু বিদ্যুতের মতো ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর কাছে সামান্য অসাবধানতাও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধু দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ করলেই হবে না; প্রতিরোধমূলক উদ্যোগও জরুরি। স্কুল, ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ নিরাপত্তা বিষয়ে প্রচারণা বাড়ানো গেলে এমন অনেক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব।শেষ কথামণিরামপুরের খোজালীপুর গ্রামের এই মর্মান্তিক ঘটনা মুহূর্তেই একটি পরিবারকে শোকের সাগরে ভাসিয়েছে। আম পাড়তে গিয়ে বিদ্যুতের স্পর্শে প্রাণ হারানো আলমগীর হোসেনের মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি গ্রামাঞ্চলের নিরাপত্তা সচেতনতার ঘাটতিরও একটি নির্মম উদাহরণ হয়ে থাকল।
এখন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে যেন এমন দুর্ঘটনা আর না ঘটে সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বিদ্যুৎ লাইনের আশপাশে বসবাসকারী মানুষকে আরও সচেতন করা হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর