প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৪ মে ২০২৬
অ্যালকোহল ছাড়লে কি শরীর আগের অবস্থায় ফিরতে পারে? নতুন গবেষণায় মিলল আশার বার্তা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা কাজের চাপ শেষে একটু স্বস্তি—অনেকের জীবনেই অ্যালকোহল যেন নীরব সঙ্গী। কেউ বিয়ার, কেউ ওয়াইন, আবার কেউ শক্ত মদে অভ্যস্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই অভ্যাস শরীরের ভেতরে এমন কিছু ক্ষতি তৈরি করে, যার প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে থেকে যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে বিজ্ঞানীরা আশার কথাও শুনিয়েছেন—সময়মতো মদ্যপান বন্ধ করলে শরীরের অনেক ক্ষতি ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালকোহলকে শুধু সামাজিক পানীয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করার পাশাপাশি হৃদ্রোগ, ক্যানসার, লিভারের জটিলতা এবং মানসিক সমস্যার ঝুঁকিও বাড়ায়। তবু ভালো খবর হলো, শরীরের কিছু অংশ নিজে থেকেই পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা রাখে—যদি মানুষ সময়মতো অ্যালকোহল থেকে দূরে সরে আসে।‘নিরাপদ মাত্রা’ নিয়ে নতুন প্রশ্নডেনভারের ন্যাশনাল জিউইশ হেলথের কার্ডিওভাসকুলার বিশেষজ্ঞ Andrew Freeman মনে করেন, অ্যালকোহলকে নিরাপদ ভাবার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। তার ভাষায়, অ্যালকোহল এমন একটি রাসায়নিক পদার্থ, যা জীবাণু ধ্বংস করতেও ব্যবহৃত হয়। ফলে শরীরের জন্য এর প্রকৃত নিরাপদ মাত্রা আছে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অ্যালকোহল অন্তত ৬০টির বেশি রোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যাটি লিভার, লিভার সিরোসিস, গ্যাস্ট্রিক আলসার, প্যানক্রিয়াটাইটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ এবং বিভিন্ন মানসিক জটিলতা। এছাড়া স্তন ক্যানসার, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস ও স্মৃতিভ্রংশজনিত রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতায় দ্রুত প্রভাববিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেকেই মনে করেন অল্প পরিমাণ অ্যালকোহল শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র একবার মদ্যপানের পরও খুব অল্প সময়ের মধ্যে শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, অ্যালকোহল শরীরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধক কোষের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত মদ্যপানে এসব কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা ও অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই শারীরিক দুর্বলতা বা দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে।মস্তিষ্কেও পড়ে প্রভাবঅ্যালকোহলের প্রভাব শুধু লিভার বা হৃদ্যন্ত্রে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকরা বলছেন, এটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলে। নিয়মিত অতিরিক্ত মদ্যপানে মনোযোগ কমে যাওয়া, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।তবে ইতিবাচক বিষয় হচ্ছে, অ্যালকোহল ত্যাগ করার পর মস্তিষ্ক কিছুটা পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায়। কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, মদ্যপান বন্ধ করার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই স্মৃতি, মনোযোগ এবং মানসিক স্থিতিশীলতায় উন্নতি দেখা দিতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মস্তিষ্কে নিজেকে পুনর্গঠনের একটি স্বাভাবিক ক্ষমতা রয়েছে। তাই যত দ্রুত অ্যালকোহল ত্যাগ করা যায়, পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও তত বাড়ে।ক্যানসারের ঝুঁকিতে বড় ভূমিকাচিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এখন অ্যালকোহলকে ক্যানসারের অন্যতম বড় ঝুঁকির কারণ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে তামাক ও স্থূলতার পর এটিকে অন্যতম প্রতিরোধযোগ্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।গবেষকদের মতে, অ্যালকোহল শরীরের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি করে। এই প্রদাহ কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুখগহ্বর, খাদ্যনালী, লিভার ও স্তন ক্যানসারের সঙ্গে অ্যালকোহলের সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে।তবে আশার দিক হলো, অ্যালকোহল গ্রহণ বন্ধ করলে শরীর ধীরে ধীরে ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। যদিও সব ক্ষতি পুরোপুরি মুছে যায় না, তবু ক্যানসারের অগ্রগতি কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।হৃদ্রোগ নিয়ে পুরোনো ধারণা বদলাচ্ছেএকসময় ধারণা ছিল, অল্প পরিমাণ ওয়াইন বা কিছু অ্যালকোহল হৃদ্যন্ত্রের জন্য উপকারী হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা সেই ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন সামান্য অ্যালকোহলও রক্তচাপ বাড়াতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ানোর কারণ হতে পারে। ফলে অনেক চিকিৎসক এখন ‘পরিমিত মদ্যপান’ ধারণার বদলে যতটা সম্ভব কম গ্রহণ বা পুরোপুরি বন্ধ করার পরামর্শ দিচ্ছেনসামাজিক বাস্তবতা ও নতুন ভাবনাবাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে প্রকাশ্যে মদ্যপান এখনো অনেক ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়। তবে বিশ্বজুড়ে অ্যালকোহল-নির্ভর সামাজিক সংস্কৃতি বাড়ছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পার্টি সংস্কৃতি এবং মানসিক চাপ থেকেও অনেকে অ্যালকোহলের দিকে ঝুঁকছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেকেই অ্যালকোহলকে সাময়িক স্বস্তির মাধ্যম হিসেবে দেখেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি মানসিক ও শারীরিক দুই ধরনের সমস্যাই বাড়াতে পারে। তাই শুধু চিকিৎসা নয়, সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যালকোহল ছাড়ার সিদ্ধান্ত একদিনে সহজ হয় না। তবে পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং চিকিৎসকের সহায়তা থাকলে পুনরুদ্ধারের পথ অনেকটাই সহজ হতে পারে।সময়মতো সিদ্ধান্তই বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারেগবেষকদের ভাষায়, অ্যালকোহলের ক্ষতি অনেক সময় ধীরে ধীরে শরীরে জমতে থাকে। তাই মানুষ অনেক ক্ষেত্রে বিপদের গভীরতা বুঝতে পারেন না। কিন্তু শরীরের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এটি নিজেকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করে।
সঠিক সময়ে মদ্যপান কমানো বা পুরোপুরি বন্ধ করা গেলে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, মস্তিষ্ক এবং কিছু অঙ্গের কার্যকারিতা আংশিক বা অনেক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে। যদিও গুরুতর ক্ষতির ক্ষেত্রে চিকিৎসা প্রয়োজন হয়, তবু জীবনযাত্রায় পরিবর্তন ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর