প্রিন্ট এর তারিখ : ১৪ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৪ মে ২০২৬
চট্টগ্রামে জনসমুদ্র ও অশ্রুর বিদায়: সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে শেষ শ্রদ্ধা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
চট্টগ্রামে দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের ইতি টেনে শেষ বিদায় নিলেন সাবেক মন্ত্রী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা Engineer Mosharraf Hossain। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) নগরীর জমিয়াতুল ফালাহ মাঠে অনুষ্ঠিত জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামে। মুহুর্মুহু স্লোগান, কান্না আর স্মৃতিচারণায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। জানাজা শেষে তাঁকে মিরসরাইয়ে পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে চট্টগ্রামের উন্নয়ন, মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই নেতার মৃত্যুতে দল-মত নির্বিশেষে সব মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।জানাজার মাঠে জনস্রোত, কান্না আর স্মৃতির ভিড়বেলা ১১টার আগেই জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ মাঠে মানুষের ঢল নামে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা হাজারো মানুষ শেষবারের মতো দেখতে ভিড় করেন Engineer Mosharraf Hossain-কে।জানাজার আগে পুরো মাঠে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কারও হাতে ফুল, কারও চোখে দীর্ঘ রাজনৈতিক স্মৃতির ভার—সব মিলিয়ে দৃশ্যটি হয়ে ওঠে ভারী ও বিষণ্ন।জানাজায় অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ জানান, তিনি শুধু একজন রাজনীতিক ছিলেন না, চট্টগ্রামের উন্নয়ন-ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায় ছিলেন। সেই কারণেই শেষ বিদায়ে মানুষের উপস্থিতি এত বিশাল।রাজনৈতিক ভিন্নতা ভুলে শেষ শ্রদ্ধাজানাজায় যোগ দেন নানা রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা। উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিএনপি নেতা Dr Shahadat Hossain। তিনি বক্তব্যে বলেন, মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রামের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য।এছাড়া সাবেক সিটি মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও শ্রদ্ধা জানান।একই মঞ্চে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, সিপিবি ও অন্যান্য দলের নেতাদের উপস্থিতি অনেকেই “রাজনৈতিক সৌজন্যের বিরল উদাহরণ” হিসেবে দেখছেন।শেষ যাত্রা: চট্টগ্রাম থেকে মিরসরাইজানাজা শেষে মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলে পুরো মাঠে শুরু হয় স্লোগান আর কান্নার দৃশ্য। অনুসারীরা একসঙ্গে উচ্চারণ করেন—“বীর চট্টলার মোশাররফ ভাই, আমরা তোমায় ভুলি নাই” এবং “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু”।এরপর মরদেহ নিয়ে যাত্রা করা হয় তাঁর জন্মস্থান মিরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামের উদ্দেশে। সেখানে দ্বিতীয় জানাজার পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জানাজা ও দাফন কার্যক্রম শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।রাজনৈতিক জীবন ও দীর্ঘ পথচলা১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি মিরসরাইয়ের ধুম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন Engineer Mosharraf Hossain। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের সাবসেক্টর কমান্ডার হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।তিনি স্বাধীনতার পর একাধিকবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়েও দায়িত্বে ছিলেন।রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে সমর্থকেরা দাবি করেন।তবে রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায়ে ২০২৪ সালের পরের পরিস্থিতিতে তিনি গ্রেপ্তার ও কারাবাসের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান, পরে শারীরিক অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।ভিন্ন ভিন্ন মত, একই শোকের ছায়াজানাজায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা তাঁর অবদান নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্য করেন। কেউ তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের “অগ্রসারী সংগঠক” হিসেবে অভিহিত করেন, কেউ আবার চট্টগ্রামের উন্নয়ন রাজনীতির “প্রভাবশালী মুখ” হিসেবে স্মরণ করেন।অন্যদিকে তাঁর ছেলে সাবেদুর রহমান বাবার রাজনৈতিক জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তিনি জনগণের উন্নয়নের জন্য কাজ করে গেছেন এবং সবার দোয়া কামনা করেন।সামাজিক প্রভাব: এক নেতার বিদায়ে জনমনে যে শূন্যতাচট্টগ্রামের মতো শিল্পনগরীতে দীর্ঘ সময় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা একজন নেতার মৃত্যু শুধু একটি পারিবারিক শোক নয়, বরং একটি সামাজিক ঘটনাও। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন দীর্ঘ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বিদায়ে স্থানীয় রাজনীতিতে শূন্যতা তৈরি হয়, যা পরবর্তী নেতৃত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।একই সঙ্গে তাঁর জানাজায় বিপুল জনসমাগম প্রমাণ করে, স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাব এখনো কতটা শক্তিশালী। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ধরনের জনসমাগম যতটা আবেগের বহিঃপ্রকাশ, ততটাই একটি যুগের সমাপ্তির প্রতীকও।চট্টগ্রামের উন্নয়ন ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা যেমন আলোচনায় থাকবে, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিতর্কিত দিকগুলোও ভবিষ্যতে বিভিন্ন মূল্যায়নের অংশ হবে।শেষ কথাEngineer Mosharraf Hossain-এর মৃত্যু চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়েছে। জানাজায় মানুষের ঢল, দল-মত নির্বিশেষে উপস্থিতি এবং আবেগঘন বিদায়—সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি জানাজা ছিল না, বরং একটি সময়ের বিদায়ও ছিল।
তাঁর রেখে যাওয়া রাজনৈতিক ইতিহাস ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটা গ্রহণ করবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর