প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুন ২০২৫
মুখোশের আড়ালে অপরাধ সম্রাট: কাকড়াবুনিয়ায় আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতা ‘ফোরকান মিয়া’
||
মির্জাগঞ্জ, পটুয়াখালী | অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনরাজনীতির আড়ালে সন্ত্রাসের ছায়া!রাজনীতি যেখানে হওয়ার কথা ছিল জনসেবার মহান মাধ্যম, সেখানে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার কাকড়াবুনিয়া ইউনিয়নে সেটিই পরিণত হয়েছে এককেন্দ্রিক সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক চক্রের অভয়ারণ্যে। এই অবক্ষয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় সাধারণ সম্পাদক পদধারী ব্যক্তি—ফোরকান মিয়া।দলীয় পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে গত এক দশকে গড়ে তুলেছেন এক ত্রাসনির্ভর অপরাধ সাম্রাজ্য, যেখানে অস্ত্রের ঝনঝনানি, মাদকের ছড়াছড়ি আর প্রতিপক্ষ দমনে নির্মম কৌশলই তার প্রধান অস্ত্র।অস্ত্রের ছায়ায় প্রভাব বিস্তার: স্থানীয় জনগণ আতঙ্কে বন্দিবিশ্বস্ত সূত্র বলছে, ফোরকান মিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন একটি সশস্ত্র দল, যারা এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখল, ও প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলার মতো কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। এদের রয়েছে ‘তথ্য সংগ্রহকারী বাহিনী’ যারা সর্বক্ষণ নজরে রাখে কে কী বলছে, কোথায় যাচ্ছে।একজন স্থানীয় স্কুলশিক্ষক জানান, “তার নাম নেওয়াটাই রিস্ক হয়ে গেছে। কেউ মুখ খুললেই রাতের আঁধারে গায়েবি মামলা বা শারীরিক হামলা।”আর্থিক উত্থান ও অপ্রত্যাশিত সম্পদের পাহাড়এক সময়ের মধ্যবিত্ত ফোরকান মিয়া হঠাৎ করে কীভাবে এলাকা জুড়ে একাধিক দালানকোঠার মালিক হলেন, সেটি আজ বড় প্রশ্ন। তার সাদা মার্বেলের প্রাসাদতুল্য বাড়িটি আজ স্থানীয়দের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।এলাকাবাসীর ভাষায়, তার আয়ের প্রকৃত কোনো উৎস দৃশ্যমান নয়। নেই কোনো নিবন্ধিত ব্যবসা বা পেশাগত পরিচয়। অথচ তার বিলাসবহুল জীবনযাপন, অবকাঠামো, জমির পরিমাণ এবং প্রভাব—সব কিছুই নির্দেশ করে, এর পেছনে রয়েছে মাদক ও অপরাধভিত্তিক অর্থনীতি।প্রশাসন নীরব, নাকি প্রশ্রয়দাতা?ফোরকান মিয়ার বিরুদ্ধে জমি দখল, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র মজুদ এবং সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার বহু লিখিত অভিযোগ মির্জাগঞ্জ থানায় জমা পড়লেও, আশ্চর্যজনকভাবে সেগুলোর অধিকাংশই "তদন্তাধীন" রয়েছে।স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, প্রশাসনের কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে, যার ফলে তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফাঁস হওয়া একাধিক ছবি ও ভিডিওতে প্রশাসনিক ব্যক্তিদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা পরিলক্ষিত হয়েছে।নতুন প্রজন্ম ধ্বংসের পথে: মাদক ও অপরাধের বিষবাষ্পস্থানীয় তরুণদের একটি অংশ এখন ফোরকান মিয়ার অপরাধচক্রের অন্তর্ভুক্ত। স্কুল-কলেজে ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতি কমে যাচ্ছে, বাড়ছে মাদকাসক্তি, অপরাধ প্রবণতা ও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি। এলাকার অভিভাবক মহলে উৎকণ্ঠা চরমে।একজন প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা বলেন, “আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম একটি উন্নত ও আদর্শিক রাজনীতির। কিন্তু এখানে দেখি দলীয় পরিচয় মানেই এখন ক্ষমতা, ভয় আর অন্যায়ের অবাধ ছাড়।”সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি আওয়ামী লীগযদিও আওয়ামী লীগের আদর্শ জনসেবা ও তৃণমূল উন্নয়ন, তবু এই ধরনের নেতার কারণে দলের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়ছে। একজন লোকাল ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা যখন এলাকায় অপরাধ জগতের রূপক হয়ে ওঠে, তখন শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থাই নয়—সামগ্রিক সামাজিক কাঠামো বিপন্ন হয়ে পড়ে।মুখোশ খোলার সময় এখনইফোরকান মিয়া এখন আর কেবল একটি নাম নয়, বরং একটি প্রতীক—যা নির্দেশ করে কীভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে অপরাধ চক্র গড়ে তোলা যায়। এই মুখোশধারীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় না আনলে, কাকড়াবুনিয়া শুধু নয়, গোটা দেশেই এই সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়বে।প্রতিবেদন: অনুসন্ধান টিম | তথ্যসূত্র: স্থানীয় পর্যবেক্ষণ, ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার ও নথিভুক্ত অভিযোগ।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর