প্রিন্ট এর তারিখ : ১৩ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘ হলে চাপে পড়তে পারেন ২০ লাখ বাংলাদেশি, সতর্ক করল রামরু
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দীর্ঘ সময় ধরে চললে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশির নিরাপত্তা, চাকরি ও জীবনযাত্রা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।বুধবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাব-এ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রামরু এ আশঙ্কার কথা তুলে ধরে। ‘ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি: বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের ওপর প্রভাব ও করণীয়’ শীর্ষক ওই আয়োজনে গবেষক ও অভিবাসন বিশ্লেষকেরা বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে শুধু শ্রমবাজার নয়, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।আমিরাতে বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগসংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এখন ধীরে ধীরে উপসাগরীয় দেশগুলোকেও সরাসরি প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকির মধ্যে দেখা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়।এ পরিস্থিতিতে দেশটিতে কর্মরত প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশি নানা ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে রামরু। প্রতিষ্ঠানটির মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও তীব্র হলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তাজনিত আতঙ্কও বাড়বে। এতে বহু প্রবাসী শ্রমিক কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।সৌদির মেগা প্রকল্পগুলো নিয়েও অনিশ্চয়তারামরু জানায়, চলমান অস্থিরতার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশে চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে Saudi Arabia-এর বহুল আলোচিত ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচির আওতাধীন কয়েকটি বড় প্রকল্প নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।নিওম সিটি, রেড সি টুরিজম ডেভেলপমেন্ট ও কিদ্দিয়া এন্টারটেইনমেন্ট সিটির মতো প্রকল্পে বিপুলসংখ্যক বিদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ছিল। বাংলাদেশ থেকেও অনেক কর্মী এসব প্রকল্পে কাজের আশায় প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেলে বা প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এলে সেই সম্ভাবনা বড় ধাক্কা খেতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।তাদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হলে অবকাঠামো খাত, নির্মাণশিল্প ও সেবা খাতে নতুন কর্মী নিয়োগ কমে যেতে পারে। এতে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।কর্মী পাঠানো বিলম্বিত, বাড়ছে ভোগান্তিসংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যে অভিবাসী কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও পড়তে শুরু করেছে। আকাশপথে চলাচল সংকট, ফ্লাইট বাতিল এবং ভ্রমণ অনিশ্চয়তার কারণে অনেক কর্মীর যাত্রা পিছিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার ভিসা পেয়েও সময়মতো যেতে পারছেন না।এ অবস্থায় বিদেশগামী কর্মী ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মধ্যে নতুন করে বিরোধ বাড়ছে বলেও দাবি করা হয়। অনেক কর্মী নিয়োগ বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা পরিশোধ করলেও নির্ধারিত সময়ে বিদেশ যেতে না পারায় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।রামরুর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে টিকিটের অর্থ ফেরত, চুক্তি বাতিল ও ভিসা জটিলতা নিয়ে নতুন সমস্যাও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্নসংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রস্তুতির ঘাটতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। রামরুর মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে চাকরি হারানো, আহত হওয়া বা দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়া অভিবাসী কর্মীদের সহায়তায় এখনো কার্যকর কোনো জরুরি তহবিল নেই।এ ছাড়া আটকে পড়া কর্মীদের তথ্য সংগ্রহ, বাতিল ফ্লাইট পর্যবেক্ষণ কিংবা দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য কোনো সমন্বিত রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি বলে দাবি করা হয়।গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, সংঘাতকবলিত অঞ্চল থেকে দেশে ফেরা শ্রমিকদের পুনর্বাসনের জন্য আলাদা কোনো পুনঃএকত্রীকরণ কর্মসূচিও নেই। ফলে অনেকেই দেশে ফিরে নতুন করে জীবিকা শুরু করতে হিমশিম খেতে পারেন।বিশেষ করে নারী গৃহকর্মীদের বড় একটি অংশ সংকটকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে তাদের অবস্থান শনাক্ত ও সহায়তা দেওয়া আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।“আলাদা জরুরি তহবিল দরকার”সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ড. তাসনিম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষার জন্য জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা জরুরি।তার মতে, শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বহু বাংলাদেশি কর্মী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। আনুমানিক ১০ হাজার শ্রমিক আটকে থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।ড. তাসনিমের দাবি, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিতে আগ্রহ হারাচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।তিনি আরও বলেন, কিছু আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী মধ্যপ্রাচ্য থেকে ব্যবসা অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে Turkey-এর মতো দেশে বিনিয়োগ স্থানান্তরের প্রবণতা বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।নতুন শ্রমবাজার খোঁজার তাগিদগবেষকেরা মনে করছেন, বাংলাদেশকে এখন থেকেই বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধানের দিকে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা শিক্ষা এবং আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে দেশের অভিবাসন খাত।তাদের মতে, শুধু মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল হাজারো পরিবার ইতোমধ্যে উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সেই চাপ আরও বাড়বে। ফলে বিষয়টি শুধু পররাষ্ট্রনীতি বা শ্রমবাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক পর্যবেক্ষণসংবাদ সম্মেলনে সরাসরি কোনো দেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ না তুললেও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে “বাংলাদেশের অভিবাসন খাতের জন্য বড় সতর্ক সংকেত” হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এখনই সমন্বিত প্রস্তুতি না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে।
তারা বলছেন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের সুরক্ষা, জরুরি সহায়তা ও পুনর্বাসনের জন্য দ্রুত কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সংকটকালীন তথ্য সংগ্রহ ও যোগাযোগব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার ওপরও জোর দেওয়া হয়।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর