প্রিন্ট এর তারিখ : ১৩ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ মে ২০২৬
সিরাজদিখানে প্রকাশ্যে মাদক সেবনের অভিযোগে দুই যুবকের কারাদণ্ড, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান ঘিরে চাঞ্চল্য
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে প্রকাশ্যে ইয়াবা সেবনের অভিযোগে দুই যুবককে ১০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরে পরিচালিত এক অভিযানে তাঁদের হাতেনাতে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে প্রশাসন। ঘটনাটি এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।হঠাৎ অভিযান, মধ্যদুপুরে ধরা পড়লেন দুই যুবকস্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত মাদকবিরোধী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত সিরাজদিখান উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সিনথিয়া হোসেন।অভিযান চলাকালীন আবিরপাড়া এলাকার আলাউদ্দিন কমপ্লেক্সের সামনে দুই যুবককে সন্দেহজনক অবস্থায় দেখতে পান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পরে তাদের পর্যবেক্ষণে প্রকাশ্যে ইয়াবা সেবনের প্রমাণ পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়।তাৎক্ষণিকভাবে তাদের আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সামনে হাজির করা হয় এবং সেখানেই বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।আটক দুই যুবকের পরিচয়দণ্ডপ্রাপ্ত দুই যুবক হলেন—
মো. সুমন (২৬), সিরাজদিখান উপজেলার কেয়াইন ইউনিয়নের শিকারপুর গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে
আশিক (২০), গাইবান্ধা সদর থানার কামারখালী গ্রামের রশিদুলের ছেলে
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তারা ওই এলাকায় অবস্থান করছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ প্রশাসনিকভাবে আলাদাভাবে যাচাই করা হয়নি।ভ্রাম্যমাণ আদালতের রায় ও আইনগত ভিত্তিঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানো হয়। বিচার কার্যক্রম শেষে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(৫) ধারায় প্রত্যেককে ১০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সিনথিয়া হোসেন জানান, প্রকাশ্যে মাদক সেবনের বিষয়টি সরাসরি ধরা পড়ায় দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।তিনি বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান কোনো এককালীন নয়, এটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। সমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি।”দণ্ড ঘোষণার পর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাদের থানায় হস্তান্তর করা হয় বলে নিশ্চিত করেছে প্রশাসন।প্রশাসনের অবস্থান: মাদকবিরোধী অভিযান চলমান থাকবেসিরাজদিখান উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাদক প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রকাশ্যে মাদক সেবন, বিক্রি বা বহনের মতো অপরাধে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “অনেক সময় দেখা যায় ছোট অপরাধগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, কিন্তু এই ছোট ঘটনাগুলোই বড় অপরাধে রূপ নেয়। তাই আমরা শুরুতেই ব্যবস্থা নিচ্ছি।”প্রশাসনের মতে, এলাকায় তরুণদের মধ্যে মাদকের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত অভিযান ও জনসচেতনতা জরুরি।স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া: স্বস্তি ও উদ্বেগ একসাথেঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন, আবার কেউ কেউ বলছেন, শুধু অভিযান নয়, মাদকের উৎস বন্ধ করা আরও জরুরি।একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “এভাবে প্রকাশ্যে মাদক সেবন করলে তরুণরা খারাপ দিকে যাবে। প্রশাসন ধরেছে এটা ভালো, কিন্তু এটা যেন নিয়মিত হয়।”অন্যদিকে আরেকজন দোকানদার বলেন, “শুধু কয়েকজনকে ধরলে হবে না, যারা এগুলো সরবরাহ করে তাদেরও ধরতে হবে।”মাদক সমস্যা: গ্রামীণ এলাকায় বাড়ছে উদ্বেগবিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শহর নয়, এখন গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও মাদকের বিস্তার একটি বড় সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য নেশাজাত দ্রব্য সহজলভ্য হওয়ায় তরুণদের একটি অংশ এতে জড়িয়ে পড়ছে।সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, বেকারত্ব, হতাশা এবং পর্যাপ্ত বিনোদনের অভাব অনেক তরুণকে বিপথে ঠেলে দিচ্ছে।একজন সমাজ গবেষক বলেন, “আইন প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ, তবে এর পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আরও সক্রিয় হতে হবে। না হলে শুধু অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসবে না।”আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতার প্রয়োজনমাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বারবার বলছেন, মাদক নির্মূল শুধু আইনি ব্যবস্থা দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।অভিযানের পাশাপাশি স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সচেতনতা কর্মসূচি, অভিভাবকদের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।একজন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা যদি শুধু ধরতে থাকি কিন্তু প্রতিরোধ না করি, তাহলে সমস্যার মূল সমাধান হবে না।”উপসংহার: একটি অভিযান, বড় সামাজিক বার্তাসিরাজদিখানের এই ঘটনা শুধু দুই যুবকের দণ্ডাদেশ নয়, বরং একটি বড় সামাজিক সংকেতও দেয়। প্রকাশ্যে মাদক সেবনের মতো ঘটনা প্রশাসন যত দ্রুত শনাক্ত করছে, ততই বোঝা যাচ্ছে সমস্যার গভীরতা।ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই পদক্ষেপ সাময়িকভাবে একটি বার্তা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে মাদক নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, এই ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। তবে সমাজের সব স্তরের অংশগ্রহণ ছাড়া মাদকমুক্ত এলাকা গড়া সম্ভব নয়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর