প্রিন্ট এর তারিখ : ১২ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ মে ২০২৬
রেডিওথেরাপি মানেই আতঙ্ক নয়, ক্যান্সার চিকিৎসায় কেন বাড়ছে এই পদ্ধতির গুরুত্ব
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
ক্যান্সার চিকিৎসা নিয়ে মানুষের ভয় নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে রেডিওথেরাপির নাম শুনলেই এখনো অনেক রোগী ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। কেউ ভাবেন শরীর পুড়ে যাবে, কেউ মনে করেন চিকিৎসার পর রোগী আর স্বাভাবিক থাকবেন না। আবার অনেকের ধারণা, রেডিওথেরাপি মানেই রোগ শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তবে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবতা এর চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন। আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির কারণে বর্তমানে রেডিওথেরাপি আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত এবং কার্যকর হয়ে উঠেছে।চিকিৎসকদের মতে, ক্যান্সার মোকাবিলায় অস্ত্রোপচার ও ওষুধভিত্তিক চিকিৎসার পাশাপাশি রেডিওথেরাপি এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে এটি ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে, আবার কারও ক্ষেত্রে রোগ নিরাময়ের সম্ভাবনাও তৈরি করে। পাশাপাশি ক্যান্সারজনিত ব্যথা, রক্তক্ষরণ, শ্বাসকষ্ট কিংবা গিলতে সমস্যার মতো জটিল উপসর্গ কমাতেও এই চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।ভয় ও ভুল ধারণার কারণে দেরি হচ্ছে চিকিৎসায়বাংলাদেশে এখনো রেডিওথেরাপি নিয়ে নানা ধরনের কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত রয়েছে। চিকিৎসকদের দাবি, এসব ভুল তথ্যের কারণে অনেক রোগী প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও সময়মতো চিকিৎসা শুরু করেন না। কেউ কেউ চিকিৎসার মাঝপথেও বন্ধ করে দেন।বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক মানুষ মনে করেন রেডিওথেরাপি নিলে পুরো শরীর ‘রেডিয়েশনে আক্রান্ত’ হয়ে যায়। কেউ আবার ধারণা করেন, রোগীর কাছে গেলে অন্যরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। চিকিৎসকদের মতে, বাহ্যিক রেডিওথেরাপির ক্ষেত্রে এমন আশঙ্কার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সাধারণভাবে রোগী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই থাকতে পারেন।তাদের মতে, অন্যের নেতিবাচক অভিজ্ঞতার গল্প, সামাজিক ভয় এবং চিকিৎসা বিষয়ে অজ্ঞতাই এই আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেকে রেডিওথেরাপিকে অত্যন্ত কষ্টকর বা ‘শেষ চিকিৎসা’ হিসেবে দেখেন।সব রোগীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া একরকম নয়রেডিওথেরাপি নিয়ে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের জায়গা হলো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। তবে চিকিৎসকদের ভাষ্য, সব রোগীর শরীরে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। এটি নির্ভর করে ক্যান্সারের ধরন, আক্রান্ত স্থান, রেডিওথেরাপির মাত্রা এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর।সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা হিসেবে ক্লান্তি বা দুর্বলতার কথা উল্লেখ করছেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসা চলাকালে বা শেষে অনেক রোগী অতিরিক্ত বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভব করেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সমস্যা সাময়িক।এ ছাড়া চিকিৎসা দেওয়া স্থানে ত্বক লালচে বা কালচে হয়ে যাওয়া, হালকা জ্বালাপোড়া, শুষ্কতা কিংবা চুলকানির মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। মাথা বা ঘাড়ে রেডিওথেরাপি হলে অনেকের গিলতে কষ্ট হয়, মুখে ঘা তৈরি হতে পারে কিংবা খাবারের স্বাদ বদলে যেতে পারে।অন্যদিকে পেট বা তলপেটের অংশে রেডিওথেরাপি হলে বমিভাব, পাতলা পায়খানা বা হজমের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, মাথায় রেডিওথেরাপি দেওয়া হলে সাধারণত নির্দিষ্ট অংশের চুল পড়ে যেতে পারে, পুরো শরীরের নয়।তাদের দাবি, অধিকাংশ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াই চিকিৎসা শেষ হওয়ার কিছুদিন পর ধীরে ধীরে কমে আসে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।আধুনিক প্রযুক্তিতে বেড়েছে নিরাপত্তাক্যান্সার চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের তুলনায় এখন রেডিওথেরাপি অনেক বেশি নির্ভুলভাবে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে কেবল আক্রান্ত অংশকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা দেওয়া যায়। ফলে আশপাশের সুস্থ কোষের ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়।চিকিৎসকরা বলছেন, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়েছে। একই সঙ্গে রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসার ধরনও পরিবর্তন করা যায়।তবে দেশে এখনো পর্যাপ্ত ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র না থাকায় অনেক রোগীকে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় চিকিৎসা পেতে ভোগান্তির কথাও জানিয়েছেন রোগী ও স্বজনরা।পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমাতে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবেবিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চললে রেডিওথেরাপির সময় শারীরিক জটিলতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।এর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত পানি পান, সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া। চিকিৎসা দেওয়া স্থানে ঘষাঘষি বা গরম সেঁক না দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।চিকিৎসকদের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের হারবাল উপাদান, তেল বা ক্রিম ব্যবহার না করতেও সতর্ক করা হয়েছে। কারণ কিছু উপাদান ত্বকের জটিলতা বাড়িয়ে দিতে পারে।মুখগহ্বরের ক্যান্সার বা মাথা-ঘাড়ে রেডিওথেরাপি নেওয়া রোগীদের মুখ ও দাঁতের বিশেষ যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আলাদা খাদ্যতালিকাও অনুসরণ করতে বলা হচ্ছে।কোন লক্ষণে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবেচিকিৎসা চলাকালে কিছু উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, শ্বাসকষ্ট, গিলতে না পারা, বারবার বমি হওয়া, তীব্র ডায়রিয়া, অসহনীয় ব্যথা, ত্বকে গুরুতর ক্ষত কিংবা অস্বাভাবিক রক্তপাত।তাদের মতে, এসব উপসর্গকে অবহেলা করলে জটিলতা বাড়তে পারে। তাই যেকোনো পরিবর্তন দ্রুত চিকিৎসককে জানানো প্রয়োজন।সামাজিক প্রভাব ও সচেতনতার ঘাটতিবিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসা নিয়ে এখনো সচেতনতার বড় ঘাটতি রয়েছে। অনেক পরিবার ভয়, লজ্জা কিংবা ভুল ধারণার কারণে রোগ গোপন রাখে। আবার কেউ কেউ বিকল্প চিকিৎসা বা অপচিকিৎসার দিকে ঝুঁকে পড়েন। এতে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হয়।স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, ক্যান্সার নিয়ে সামাজিক ভয় কমাতে গণসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। হাসপাতালভিত্তিক কাউন্সেলিং, রোগী ও পরিবারের মানসিক সহায়তা এবং সহজ ভাষায় তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।তাদের মতে, রেডিওথেরাপি নিয়ে অযথা আতঙ্ক ছড়ানোর বদলে রোগীদের বাস্তব তথ্য জানানো প্রয়োজন। কারণ ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।আস্থা ও তথ্যই হতে পারে বড় শক্তিচিকিৎসকদের ভাষ্য, রেডিওথেরাপি কোনো ভয়ঙ্কর শাস্তিমূলক চিকিৎসা নয়; বরং ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি কার্যকর পদ্ধতি। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা সাময়িক এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
তারা বলছেন, গুজব বা সামাজিক ভয় নয়, রোগীর উচিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের ওপর আস্থা রাখা। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা শুরু হলে অনেক ক্ষেত্রেই ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর