প্রিন্ট এর তারিখ : ১২ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ মে ২০২৬
উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে নতুন রোডম্যাপ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মশালায় গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় জোর
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে গবেষণা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকরা। রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ অনুষ্ঠিত এক জাতীয় কর্মশালায় বক্তারা বলেন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন।বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষা রূপান্তর: টেকসই উৎকর্ষতার রোডম্যাপ’ শীর্ষক কর্মশালায় দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের বর্তমান বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেখানে অংশ নেওয়া শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা উচ্চশিক্ষাকে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করার আহ্বান জানান।গবেষণাভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বকর্মশালার আলোচনায় উঠে আসে, দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো গবেষণা কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। বক্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না; বরং গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।বক্তারা বলেন, আধুনিক ল্যাব সুবিধা, পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন। গবেষণায় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনী প্রকল্পে উৎসাহ দিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলেও মত দেন তারা।অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতে মেধাবী শিক্ষার্থীর অভাব নেই, তবে পর্যাপ্ত সুযোগ ও সহায়ক পরিবেশের ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক সম্ভাবনাময় গবেষণা বাস্তব রূপ পায় না। কর্মশালায় এই সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার আহ্বানচতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়া শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যাওয়া কঠিন—এমন মন্তব্য করেন কয়েকজন বক্তা। তারা বলেন, বর্তমানে চাকরির বাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তাই শুধু প্রচলিত পাঠ্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন।আলোচনায় উঠে আসে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, রোবোটিকস এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলোকে উচ্চশিক্ষার মূলধারায় যুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, নেতৃত্বগুণ এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতা তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।বক্তারা আরও বলেন, শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরি না করে উদ্যোক্তা তৈরির দিকেও উচ্চশিক্ষাকে মনোযোগ দিতে হবে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন জরুরি বলে মত দেন তারা।পাঠক্রম আধুনিকায়নের তাগিদকর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, দেশের অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখনো পুরোনো ধাঁচের পাঠক্রম চালু রয়েছে, যা বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মক্ষেত্রে গিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন।এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পাঠ্যসূচি নিয়মিত হালনাগাদ করার সুপারিশ করা হয়। বক্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সময়োপযোগী কোর্স চালু করা গেলে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক কর্মবাজারে আরও ভালোভাবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারবেন।একই সঙ্গে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অনলাইন শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষার মান মূল্যায়নে স্বচ্ছ পদ্ধতি চালুর ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়। কয়েকজন বক্তা বলেন, উচ্চশিক্ষা খাতে গুণগত পরিবর্তন আনতে হলে শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সমন্বিত উদ্যোগের কথাআলোচনায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা পরিবেশ তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, শুধু শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না থেকে গবেষণা, সেমিনার, বিতর্ক ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে হবে।তারা আরও বলেন, শিক্ষকদের গবেষণায় উৎসাহ দিতে উপযুক্ত পরিবেশ এবং প্রণোদনা দরকার। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা ও সীমিত অর্থায়নের কারণে শিক্ষকরা গবেষণায় পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মত দেন অংশগ্রহণকারীরা।টেকসই উন্নয়নে উচ্চশিক্ষার ভূমিকাকর্মশালায় বক্তারা বলেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ ও নৈতিক মানবসম্পদ তৈরি ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু শিক্ষাদান নয়, সামাজিক সচেতনতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ও প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ঠিকই, তবে মান উন্নয়নের প্রশ্নে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে এমন কর্মশালা বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে সুপারিশকর্মশালার শেষ পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীরা উচ্চশিক্ষা খাত উন্নয়নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে—পাঠক্রম আধুনিকায়ন, গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে স্বচ্ছতা জোরদার করা।এছাড়া শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য শিল্পখাতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্ভাবনী গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপরও জোর দেওয়া হয়।
বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে আরও বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর