প্রিন্ট এর তারিখ : ১০ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬
হাওরে ভেজা ধানের দুঃসহ বাস্তবতা: সরকারি শর্তে গুদাম বন্ধ, লোকসানে দিশেহারা কৃষক
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা আর আর্দ্রতার ফাঁদে হাওরের বোরো চাষহাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য এ বছরের বোরো মৌসুম যেন আশীর্বাদের বদলে নতুন দুর্ভোগ নিয়ে এসেছে। পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমি থেকে কোনোভাবে ধান ঘরে তুললেও এখন তা বিক্রি করতে গিয়ে পড়তে হচ্ছে চরম বিপাকে। সরকারি খাদ্যগুদামে ধান দিতে গিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে শুধু আর্দ্রতার অজুহাতে। অন্যদিকে খোলাবাজারে ধানের দাম নেমে এসেছে উৎপাদন খরচের অর্ধেকেরও নিচে। ফলে লোকসান গুনে দেনা শোধ করতেই বাধ্য হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকেরা।কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওর এলাকা ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা বৃষ্টি আর রোদ না থাকায় ধান ঠিকভাবে শুকানো সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি গুদামে ধান জমা দিতে সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ আর্দ্রতার শর্ত থাকলেও কৃষকদের ধানে বর্তমানে আর্দ্রতা পাওয়া যাচ্ছে ২০ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত। এতে খাদ্যগুদাম থেকে ধান ফেরত আসছে, আর পরিবহন খরচ গুনতে গিয়ে আরও বিপদে পড়ছেন চাষিরা।উৎপাদন খরচ বাড়লেও ধানের বাজারে ধসমাঠপর্যায়ের কৃষকেরা বলছেন, এবার প্রতি একরে গড়ে প্রায় ৭০ মণ ধান উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু সেই ধান কাটতে গিয়ে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন তাঁরা। হাওরে পানিবন্দি জমি থেকে ধান তুলতে শ্রমিক সংকট এতটাই বেড়েছে যে, একরপ্রতি ধান কাটার মজুরি ৫০০-৬০০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায়।শুধু কাটাই নয়, মাড়াই, ঝাড়াই ও পরিবহন খরচও কয়েকগুণ বেড়েছে। আগে যেখানে এসব কাজে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা লাগত, এখন সেখানে খরচ হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি মণ ধান উৎপাদনে বীজ, সার, সেচ ও জমি চাষ মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে অতিরিক্ত শ্রম ও পরিবহন ব্যয় যোগ হয়ে সেই খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৫৪ টাকায়।কিন্তু বাজারে সেই ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫০০ থেকে ৮৫০ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ প্রতি মণ ধানে কয়েকশ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।সরকারি মূল্য আছে, কিন্তু কৃষকের নাগালের বাইরেসরকার চলতি মৌসুমে প্রতি মণ ধানের সংগ্রহমূল্য নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৪৪০ টাকা। গত ৩ মে থেকে সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। কিশোরগঞ্জ জেলায় এ বছর ১৮ হাজার ৩৩০ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায় সংগ্রহের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।তবে কৃষকদের অভিযোগ, এই মূল্য কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তার সুবিধা পাচ্ছেন না তাঁরা। কারণ খাদ্যগুদামে ধান জমা দিতে গিয়ে আর্দ্রতার শর্ত, ব্যাংক হিসাব, তালিকা যাচাইসহ নানা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে স্থানীয় ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে ধান বিক্রি করছেন।কৃষকদের দাবি, একশ্রেণির ব্যবসায়ী কম দামে ভেজা ধান কিনে পরে শুকিয়ে সরকারি গুদামে বেশি দামে বিক্রি করছেন। এতে প্রকৃত চাষি বঞ্চিত হচ্ছেন, আর লাভ চলে যাচ্ছে সিন্ডিকেটের হাতে।“ধান বিক্রি করলেও ক্ষতি, ঘরে রাখলেও ক্ষতি”কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার কৃষক আকরাম হোসেন বলেন, গুদামে ধান দিতে গেলে আগে খোলা মাঠে ফেলে রাখতে হয়। পরে নানা কারণে ধান ফেরত দেওয়া হয়। এতে যাতায়াত ও শ্রম খরচ বেড়ে যায়।তিনি বলেন, “প্রতিবছর চেষ্টা করি সরকারি গুদামে ধান দিতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা ঝামেলায় পারি না। এখন ধান বিক্রি করলেও ক্ষতি, ঘরে রাখলেও ক্ষতি।”একই ধরনের হতাশা দেখা গেছে সুনামগঞ্জের কৃষকদের মাঝেও। জামালগঞ্জ উপজেলার কালীপুর গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আলী আমজাদ জানান, তিন কিয়ার জমিতে চাষ করতে তাঁর খরচ হয়েছে ১০ হাজার টাকার বেশি। কিন্তু উৎপাদিত ধান ঋণ শোধের জন্য ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করার চিন্তা করছেন তিনি।আলী আমজাদের ভাষায়, “এই দামে ধান বিক্রি করলে খরচই উঠবে না। তারপরও ঋণ শোধ করতে হবে। সামনে কী হবে, বুঝতেছি না।”বড় কৃষকরাও লোকসানেসুনামগঞ্জের হালি হাওরের বড় কৃষকদের একজন মো. আয়না মিয়া বলেন, বৃষ্টির কারণে বাধ্য হয়ে তিনি ৫০০ মণ ভেজা ধান ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন।তিনি জানান, এক কিয়ার জমিতে চাষ করতে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ধান কাটতে লেগেছে আরও ৩ হাজার টাকা। পরিবহন ও গোলায় তোলার খরচ আলাদা। সব মিলিয়ে প্রতি মণে উৎপাদন খরচ পড়েছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা।আয়না মিয়ার কথায়, “এখন ধান বিক্রি করলেই লোকসান। অনেক পরিবার সামনে খাইয়া না খাইয়া থাকার অবস্থায় যাইতে পারে।”প্রশাসনের বক্তব্য কী?ইটনা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বাবুল আকরাম বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধান সংগ্রহ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা করছেন তাঁরা।উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিজয় কুমার হাওলাদার বলেন, রোদ না থাকায় কৃষকেরা ধান শুকাতে পারছেন না। ফলে গুদামে সরবরাহও কম হচ্ছে।জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেছেন, ধান সংগ্রহে কৃষকদের হয়রানি করা হলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। কোনো কৃষক অভিযোগ করলে তা গুরুত্বসহকারে দেখা হবে।অন্যদিকে সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে শুকনা ও উজ্জ্বল ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। কৃষকদের ধান ভালোভাবে শুকিয়ে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।সংকট শুধু কৃষকের নয়, খাদ্য নিরাপত্তারওবিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি শুধু কৃষকের আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। হাওরাঞ্চল দেশের বোরো ধানের বড় উৎস। সেখানে কৃষক যদি ধারাবাহিকভাবে লোকসানে পড়েন, তাহলে ভবিষ্যতে অনেকেই চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন।এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সরকারি নীতিমালায় বাস্তবতা বিবেচনায় নমনীয়তা না থাকলে প্রান্তিক কৃষকের ক্ষতি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে আর্দ্রতার নির্দিষ্ট সীমা বজায় রাখতে না পারা কৃষকদের জন্য অস্থায়ী শুকানোর ব্যবস্থা বা জরুরি সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।সামনে কী অপেক্ষা করছে?
সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। তবে কৃষকেরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে অনেকেই ঋণের বোঝা সামলাতে পারবেন না। হাওরের মাঠে ধান উঠলেও কৃষকের ঘরে স্বস্তি ফিরছে না—এমন বাস্তবতাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর