প্রিন্ট এর তারিখ : ০৯ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৯ মে ২০২৬
হামের থাবায় আরও ৯ শিশুর মৃত্যু, দেড় মাসে প্রাণ গেল ৩৫২ জনের'".
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
দেশজুড়ে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বাড়ছেই। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৯ শিশুর মৃত্যুর খবর দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে তিন শিশুর শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম শনাক্ত হয়েছিল, আর ছয়জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। সব মিলিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ৯ মে পর্যন্ত দেড় মাসে দেশে মোট ৩৫২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য। নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। একদিনেই আরও ১ হাজার ৪৩৫ শিশুর শরীরে হাম বা হামের মতো উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে।বাড়ছে সংক্রমণ, চাপ বাড়ছে হাসপাতালেস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলমান পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে শিশু রোগীর চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে জ্বর, শরীরে লালচে দানা, কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসা শিশুদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানা গেছে।গত দেড় মাসে ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হাম ধরা পড়েছে ৬ হাজার ৯৮৯ জনের শরীরে। পাশাপাশি হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৪৭ হাজার ৬৫৬ শিশু। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক পরিবার এখনও হাসপাতালে না গিয়ে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিচ্ছে।কোন বয়সী শিশুরা বেশি ঝুঁকিতেচিকিৎসকদের দাবি, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। যেসব শিশু নিয়মিত টিকা পায়নি কিংবা অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের মধ্যে জটিলতা দ্রুত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে হাম থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা তৈরি হচ্ছে, যা মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ হলেও দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতা থাকা শিশুদের জন্য এটি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা ও টিকাদান নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।স্বাস্থ্য বিভাগের সতর্কতাস্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের শিশুদের জ্বর বা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।তবে মাঠপর্যায়ে কাজ করা কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মীর অভিযোগ, কিছু এলাকায় এখনও টিকা নিয়ে ভুল ধারণা ও অনীহার কারণে শিশুদের ঝুঁকি বাড়ছে। আবার কোথাও কোথাও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কথাও উঠে এসেছে। যদিও এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি স্বাস্থ্য বিভাগ।আতঙ্কে অভিভাবকরাক্রমাগত মৃত্যুর খবরে উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যেও। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করতে দেখা গেছে অনেক পরিবারকে। কেউ কেউ বলছেন, সামান্য জ্বর হলেও এখন তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন।একাধিক হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে অতিরিক্ত রোগীর চাপের কথাও জানা গেছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য, রোগী বাড়লেও সব জায়গায় পর্যাপ্ত শয্যা ও জনবল নেই। ফলে চিকিৎসাসেবা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।কেন বাড়ছে হামের সংক্রমণ?জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, কিছু অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে না পারা এবং সচেতনতার অভাব—এসব কারণ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। করোনার সময় অনেক শিশুর নিয়মিত টিকা নেওয়া ব্যাহত হয়েছিল বলেও ধারণা করা হচ্ছে।তাদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হওয়ায় একজন আক্রান্ত শিশুর মাধ্যমে দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই শুধু চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপরও জোর দেওয়ার বিকল্প নেই।সামাজিক প্রভাবও বাড়ছেশিশুমৃত্যুর এই ধারাবাহিক ঘটনা শুধু স্বাস্থ্য খাত নয়, সামাজিকভাবেও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এই পরিস্থিতি পরিবারগুলোকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। অনেক নিম্নআয়ের পরিবার চিকিৎসার খরচ সামলাতে গিয়ে অর্থনৈতিক চাপে পড়ছে।এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে এখনও হাম নিয়ে নানা ভুল ধারণা থাকায় অনেক ক্ষেত্রে রোগের শুরুতেই সঠিক চিকিৎসা নেওয়া হচ্ছে না। জনস্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।পরিস্থিতি এখন কোথায় দাঁড়িয়েস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিদিনই নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা যোগ হচ্ছে তালিকায়। যদিও সরকারিভাবে টিকাদান ও চিকিৎসাসেবা জোরদারের কথা বলা হচ্ছে, তারপরও মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে সামনে আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করা, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর