শেরপুর শহরের একটি ভাড়া বাসাকে ঘিরে শনিবার দুপুরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাতভর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। অভিযোগ, স্বামী কাজে বাইরে থাকার সুযোগে বাড়ির মালিকের ছেলে এক তরুণ গৃহবধূর ঘরে ঢুকে তাকে ধর্ষণ করেন। খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযুক্তকে ধরে গণপিটুনি দেয় স্থানীয়রা। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। রাতেই অভিযুক্তের শাস্তির দাবিতে শহরে বিক্ষোভও হয়।
ঘটনাটি ঘটেছে শেরপুর পৌর শহরের সজবরখিলা মহল্লায়। অভিযুক্ত এনামুল হক (৩৮) একই এলাকার বাসিন্দা এবং মোবারক হোসেনের ছেলে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র। তবে পুরো বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ মাস আগে নবদম্পতি হিসেবে ওই এলাকায় ভাড়া বাসায় ওঠেন গৃহবধূ ও তাঁর স্বামী। স্বামী স্থানীয় একটি আসবাবপত্রের দোকানে কাজ করেন। কাজের কারণে দিনের দীর্ঘ সময় তাঁকে বাড়ির বাইরে থাকতে হয়।
পরিবারের অভিযোগ, বাসায় ওঠার পর থেকেই এনামুল ওই গৃহবধূকে বিভিন্নভাবে বিরক্ত করতেন। কখনও মেসেঞ্জারে কু-প্রস্তাব, কখনও নানা ধরনের লোভ দেখানো—এসব নিয়েই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীর স্বামী বলেন,
“আমাদের বিয়ে হয়েছে মাত্র আট মাস। নতুন সংসার শুরু করেছি। বাসায় ওঠার পর থেকেই এনামুল আমার স্ত্রীর সঙ্গে অশোভন আচরণ করত। বিষয়টি জানাজানি হলে একবার মীমাংসাও হয়েছিল। কিন্তু তারপরও সে থামেনি।”
তিনি আরও দাবি করেন, শনিবার দুপুরে তাঁর অনুপস্থিতিতে এনামুল কৌশলে ঘরে ঢুকে তাঁর স্ত্রীর মুখ চেপে ধর্ষণ করেন।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন ওই গৃহবধূ। পরে স্বামী বাড়ি ফিরলে তিনি পুরো ঘটনা খুলে বলেন। বিষয়টি দ্রুত আশপাশে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন স্থানীয়রা।
সন্ধ্যার দিকে অভিযুক্ত এনামুলকে খোয়ারপাড় শাপলাচত্বর মোড় এলাকায় আটক করা হয়। এরপর কয়েকজন তাকে মারধর করেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন,
“মানুষ খুব উত্তেজিত ছিল। অভিযোগ শোনার পর সবাই ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। পরে পুলিশ এসে তাকে নিয়ে যায়।”
ঘটনার পর রাতেই অভিযুক্তের শাস্তির দাবিতে শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা সদর থানার সামনেও জড়ো হন। এতে এলাকায় কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
শেরপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেল রানা বলেন,
“গণপিটুনির খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে ওই ব্যক্তিকে উদ্ধার করে থানায় আনা হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নাসরিন আক্তার বলেন,
“ঘটনার বিষয়ে আমাদের টিম কাজ করছে। যাকে গণপিটুনি দেওয়া হচ্ছিল, তাকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তবে অভিযুক্ত এনামুল বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নারী নির্যাতন বা যৌন সহিংসতার বহু ঘটনাতেই অভিযুক্তরা ভুক্তভোগীর পরিচিত কেউ হন। ভাড়া বাসা, কর্মক্ষেত্র কিংবা পারিবারিক পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে অনেক সময় হয়রানির ঘটনা ঘটে থাকে।
তাদের মতে, অনেক নারী প্রথমদিকে এসব বিষয় প্রকাশ করতে চান না। সামাজিক লজ্জা, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় কাজ করে। ফলে ছোট ছোট অস্বস্তিকর আচরণ সময়ের সঙ্গে বড় অপরাধে রূপ নিতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে কু-প্রস্তাব বা মানসিক চাপের মতো বিষয়গুলোকে পরিবার ও সমাজ গুরুত্ব না দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে হয়রানির ঘটনাও বাড়ছে বলে তারা মনে করেন।
এ ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গণপিটুনি। আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো অভিযোগ উঠলেই কাউকে মারধর করা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ তদন্ত ও বিচার শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত অভিযোগের সত্যতা যাচাই জরুরি।
তবে স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, বিচার নিয়ে মানুষের আস্থাহীনতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণেই অনেক সময় এমন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
শেরপুরের ঘটনাটি এখন পুরো এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রে। অভিযোগের তদন্ত চলছে। কিন্তু এই ঘটনা আবারও সামনে এনে দিয়েছে একটি বড় প্রশ্ন—নিজের বাসস্থানেও নারীরা কতটা নিরাপদ?

রোববার, ২৪ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬
শেরপুর শহরের একটি ভাড়া বাসাকে ঘিরে শনিবার দুপুরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাতভর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। অভিযোগ, স্বামী কাজে বাইরে থাকার সুযোগে বাড়ির মালিকের ছেলে এক তরুণ গৃহবধূর ঘরে ঢুকে তাকে ধর্ষণ করেন। খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযুক্তকে ধরে গণপিটুনি দেয় স্থানীয়রা। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। রাতেই অভিযুক্তের শাস্তির দাবিতে শহরে বিক্ষোভও হয়।
ঘটনাটি ঘটেছে শেরপুর পৌর শহরের সজবরখিলা মহল্লায়। অভিযুক্ত এনামুল হক (৩৮) একই এলাকার বাসিন্দা এবং মোবারক হোসেনের ছেলে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র। তবে পুরো বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ মাস আগে নবদম্পতি হিসেবে ওই এলাকায় ভাড়া বাসায় ওঠেন গৃহবধূ ও তাঁর স্বামী। স্বামী স্থানীয় একটি আসবাবপত্রের দোকানে কাজ করেন। কাজের কারণে দিনের দীর্ঘ সময় তাঁকে বাড়ির বাইরে থাকতে হয়।
পরিবারের অভিযোগ, বাসায় ওঠার পর থেকেই এনামুল ওই গৃহবধূকে বিভিন্নভাবে বিরক্ত করতেন। কখনও মেসেঞ্জারে কু-প্রস্তাব, কখনও নানা ধরনের লোভ দেখানো—এসব নিয়েই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীর স্বামী বলেন,
“আমাদের বিয়ে হয়েছে মাত্র আট মাস। নতুন সংসার শুরু করেছি। বাসায় ওঠার পর থেকেই এনামুল আমার স্ত্রীর সঙ্গে অশোভন আচরণ করত। বিষয়টি জানাজানি হলে একবার মীমাংসাও হয়েছিল। কিন্তু তারপরও সে থামেনি।”
তিনি আরও দাবি করেন, শনিবার দুপুরে তাঁর অনুপস্থিতিতে এনামুল কৌশলে ঘরে ঢুকে তাঁর স্ত্রীর মুখ চেপে ধর্ষণ করেন।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন ওই গৃহবধূ। পরে স্বামী বাড়ি ফিরলে তিনি পুরো ঘটনা খুলে বলেন। বিষয়টি দ্রুত আশপাশে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন স্থানীয়রা।
সন্ধ্যার দিকে অভিযুক্ত এনামুলকে খোয়ারপাড় শাপলাচত্বর মোড় এলাকায় আটক করা হয়। এরপর কয়েকজন তাকে মারধর করেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন,
“মানুষ খুব উত্তেজিত ছিল। অভিযোগ শোনার পর সবাই ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। পরে পুলিশ এসে তাকে নিয়ে যায়।”
ঘটনার পর রাতেই অভিযুক্তের শাস্তির দাবিতে শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা সদর থানার সামনেও জড়ো হন। এতে এলাকায় কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
শেরপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেল রানা বলেন,
“গণপিটুনির খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে ওই ব্যক্তিকে উদ্ধার করে থানায় আনা হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নাসরিন আক্তার বলেন,
“ঘটনার বিষয়ে আমাদের টিম কাজ করছে। যাকে গণপিটুনি দেওয়া হচ্ছিল, তাকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তবে অভিযুক্ত এনামুল বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নারী নির্যাতন বা যৌন সহিংসতার বহু ঘটনাতেই অভিযুক্তরা ভুক্তভোগীর পরিচিত কেউ হন। ভাড়া বাসা, কর্মক্ষেত্র কিংবা পারিবারিক পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে অনেক সময় হয়রানির ঘটনা ঘটে থাকে।
তাদের মতে, অনেক নারী প্রথমদিকে এসব বিষয় প্রকাশ করতে চান না। সামাজিক লজ্জা, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় কাজ করে। ফলে ছোট ছোট অস্বস্তিকর আচরণ সময়ের সঙ্গে বড় অপরাধে রূপ নিতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে কু-প্রস্তাব বা মানসিক চাপের মতো বিষয়গুলোকে পরিবার ও সমাজ গুরুত্ব না দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে হয়রানির ঘটনাও বাড়ছে বলে তারা মনে করেন।
এ ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গণপিটুনি। আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো অভিযোগ উঠলেই কাউকে মারধর করা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ তদন্ত ও বিচার শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত অভিযোগের সত্যতা যাচাই জরুরি।
তবে স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, বিচার নিয়ে মানুষের আস্থাহীনতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণেই অনেক সময় এমন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
শেরপুরের ঘটনাটি এখন পুরো এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রে। অভিযোগের তদন্ত চলছে। কিন্তু এই ঘটনা আবারও সামনে এনে দিয়েছে একটি বড় প্রশ্ন—নিজের বাসস্থানেও নারীরা কতটা নিরাপদ?

আপনার মতামত লিখুন